
গণ অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চলমান দৃশ্যমান অভিযান জোরদার হয়েছে। ধরপাকড়, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধকরণে যেমন রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে, তেমনি মামলা ও চার্জশিটেও অপেক্ষাকৃত বেশি আসামিকে অভিযুক্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সঙ্গে তুলনা করলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মামলা ও চার্জশিট—উভয়ই বেড়েছে। একই সঙ্গে দুদকের জালে ফেঁসেছেন অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সরকারি উচ্চপদস্থ আমলা।
দুদক থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির ২ হাজার ২৯৭ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৫৪১টি মামলা বা এজাহার দায়ের করেছে সংস্থাটি। একই সময়ে ১ হাজার ২০৩ জন আসামির বিরুদ্ধে ৩৪৯টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। মামলা ও চার্জশিট মিলিয়ে সাড়ে ৩ হাজার ভিআইপি আসামি দুদকের জালে ফেঁসেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ আমলে নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই দুদক। এই সময়ে বিভিন্ন শ্রেণির দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নতুন করে ১ হাজার ৬৩টি অনুসন্ধান শুরু করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ৩৮২টি সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে ১১ মাসে ২৩০ জন ব্যক্তিকে অব্যাহতি দিয়ে ৮২টি এফআর (ফাইনাল রিপোর্ট) এবং ৩৯টি পরিসমাপ্তির মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১১ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে মাত্র ৪৩৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে ৩২৮টি মামলা এবং ৩৪৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। তবে ওই বছরের নভেম্বরে কোনো কমিশন না থাকায় কোনো অনুসন্ধান বা মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। একই বছরে ২২৭টি অভিযোগ পরিসমাপ্তি বা নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয় এবং মামলা থেকে অব্যাহতি বা পরিসমাপ্তি দেওয়া হয় ৪৮টি মামলার।
এর আগের বছর ২০২৩ সালে অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে ৮৪৫টি অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ওই সময়ে ৪০৪টি মামলা এবং ৩৬৩টি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়। তবে সে বছর পরিসমাপ্তি বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির মাধ্যমে মোট ১৩ হাজার ৫৭৯টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। অর্থাৎ এসব অভিযোগে অনুসন্ধানে দুর্নীতির প্রমাণ পায়নি দুদক।
তিন বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরে মামলা, চার্জশিট এবং অনুসন্ধান—সব ক্ষেত্রেই দুদক সর্বাধিক সাফল্য দেখিয়েছে।
এ বিষয়ে দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবর আজিজী ঢাকা পোস্টকে বলেন, “দুদকের দন্ত ও নখ রয়েছে। তবে এগুলো আরও তীক্ষ্ণ করা প্রয়োজন। দুদক যথাযথ আইনি শক্তিতে সমৃদ্ধ। বিচারকাজ আরও গতিশীল করতে দুদকের জন্য আরও বিশেষ আদালত প্রয়োজন।”
দুদকের সাড়ে ৩ হাজার আসামির তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহেনা, ছেলে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোনের ছেলে রাদওয়ান মুজিব, মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকসহ শেখ পরিবারের একাধিক সদস্য।
এছাড়াও রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এস আলম গ্রুপের মালিক শামসুল আলম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক, দীপু মনি, রাশেদ খান মেনন, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নাজমুল হাসান পাপন, টিপু মুনশি, গোলাম দস্তগীর গাজী, জাহিদ মালিক, নসরুল হামিদ বিপু ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা।
আসামির তালিকায় আরও রয়েছে এস আলম গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নূরজাহান গ্রুপ, অ্যাননটেক্স গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও জেমকন গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
গত ১১ মাসে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধকরণে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে দেশে ও বিদেশে দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, সরকারি অর্থ লোপাটকারী ও ঋণখেলাপিসহ তিন শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৬ হাজার ১৩ কোটি টাকার বেশি সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের পুরো বছরে ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬১ কোটি টাকা। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে মোট ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত ১১ মাসেই নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে দুদক।
আদালত ও দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১১ মাসে দেশে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ৮৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্রোক করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২২ হাজার ২২৬ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং বিদেশে ৩২৮ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে প্রায় ২৬ হাজার ১৩ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ক্রোক ও ফ্রিজ করা হয়েছে।
এ সময় বিচারাধীন মামলার মধ্যে ২৪৯টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৬টিতে সাজা এবং ১২৩টিতে খালাস দেওয়া হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৫ হাজার ৫৮ কোটি টাকা এবং বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৩২১ কোটি টাকা। একই সময়ে ১১ হাজার ৬৩০টি অভিযোগ জমা পড়লেও মাত্র ৯৬০টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ৭৯৮টি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।