
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম–৮ আসনে ১০ দলীয় জোট আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু মাঠের গল্পটা একেবারেই অন্য রকম। বিশেষ করে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাসেরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মনোভাব, দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এবং তার জনপ্রিয়তা-সব মিলিয়ে যেন জোটের সিদ্ধান্তের ওপর ছায়া ফেলে দিয়েছে। এই দ্বন্দ্ব, এই অস্বস্তির সব রং স্পষ্ট হয়ে ওঠে আজ সোমবার বোয়ালখালীর ফুলতলার এক দুপুরে। জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ মো. ওমর বিন নুরুল আবছারের মা রুবি আক্তারের মুখে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ফুলতলায় গণসংযোগে যান। পোস্টার, মাইক, কয়েক ডজন কর্মী-সব মিলিয়ে প্রচারণার সাধারণ ছবি। কিন্তু উপস্থিত জনতার দৃষ্টি তখন অন্য দিকে শহিদ ওমরের মা রুবি আক্তার কাছে আসতেই মানুষের ভিড় জমে যায়। অল্প কথায়, শান্ত গলায়, কিন্তু ক্ষতবিক্ষত অভিজ্ঞতা আর গভীর আক্ষেপ মিশিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম–৮ আসনে স্থানীয় মানুষের ভোট বেশি। স্থানীয় মানুষ চাইবে স্থানীয় মানুষকেই ভোট দিতে।
তিনি বলেন, জুলাইকে কখনো বিক্রি করিনি, কোনো সুবিধাও নেইনি। আমরা মতো পরিবার এলাকার জন্য সবসময়ই ছিলাম। এই আসন যদি কোনো কারণে খালি হয়ে যায় বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
রুবি আক্তারের কথা মাঝপথে থামিয়ে এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, আন্টি, আমরা ১০ দলীয় জোট। সবাই যদি সহযোগিতা করে, এই সিট কখনো হাতছাড়া হবে না।
রুবি আক্তার তার কথার উত্তরে বলেন, জোট ঠিক আছে, কিন্তু এখানে স্থানীয় মানুষ অনেক বেশি। জোটের ভোট ২০ শতাংশ, স্থানীয় ভোট ৮০ শতাংশ। যাকে প্রার্থী দিয়েছেন তাকে তো কেউ চিনে না।
রুবি আক্তারের এই কথায় শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, এলাকার নির্বাচনি অঙ্কও উঠে আসে যেন ! এ সময় আসিফ মাহমুদ বলেন, আমরা তো এখনো মাঠে নেমে গেছি।
এর জবাবে রুবি আকতার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাহলে আমি বলি এই আসনটি ওপেন রাখা হোক। এনসিপিও করবে, জামায়াতের আবু নাসের ভাইও করবে।
গত ২০ জানুয়ারি ১০ দলীয় জোটের আসন বণ্টনের ঘোষণা দেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। ওই ঘোষণায় চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির জুবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকেই আসনটি নিয়ে শুরু হয় নাটকীয়তা।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ২০ জানুয়ারি। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চূড়ান্ত প্রার্থী ছাড়া অন্য সব প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করার কথা ছিল। তবে মনোনয়ন বাছাইয়ের দিনে ১০ দলীয় জোটভুক্ত তিন দলের প্রার্থী—জামায়াতে ইসলামীর ডা. আবু নাছের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ এবং এনসিপির জুবাইরুল হাসান আরিফের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাছের তা প্রত্যাহার না করায় সেদিন রাতে নগরের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ। সেখানে জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তোলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরিফ বলেন, ১০ দলীয় ঐক্যের লক্ষ্য জুলাইয়ের অর্জন বাস্তবায়ন। জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাই প্রার্থী দেবে, তবে চূড়ান্ত প্রার্থী ছাড়া অন্যরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন। কিন্তু এই আসনে অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে।
তবে পরে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি ভুল বোঝাবুঝি। জামায়াতের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তাঁরা জানিয়েছেন, ডা. আবু নাছের চট্টগ্রামে না থাকায় সময়মতো মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেননি।
২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের দিনে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী ডা. আবু নাছের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক পান। ওই দিন বিকেলে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। নগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, জোটের ঐক্যের স্বার্থে এনসিপি প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে আবু নাছের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে এর পরদিন থেকেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আবু নাছেরের সমর্থকদের একটি অংশ এনসিপির প্রার্থীকে বয়কট করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণায় নামেন। প্রতিদিন মিছিল ও স্লোগানের মাধ্যমে তারা মাঠে সক্রিয় থাকেন।
স্থানীয়দের মতে, তফসিল ঘোষণার আগে এনসিপির প্রার্থীর তেমন তৎপরতা দেখা না গেলেও জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাছের দীর্ঘদিন ধরে বোয়ালখালী–চান্দগাঁও এলাকায় কাজ করে আসছিলেন। মানবিক চিকিৎসক হিসেবে তিনি এলাকায় পরিচিত মুখ। ফলে শেষ মুহূর্তে নতুন প্রার্থী দেওয়ায় ভোটের সমীকরণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২৫ জানুয়ারি এনসিপি জামায়াতের বিরুদ্ধে জোটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন ও শরিক দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলে। দলটির দাবি, ১১ দলীয় ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জামায়াত প্রার্থী মাঠে অনড় থাকায় এবং এনসিপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে বয়কট স্লোগান দেওয়ায় রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘিত হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জামায়াতের নগর সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে এবং জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কার্যক্রম চালাচ্ছে না।