
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি ময়দানে প্রতি বৈশাখে যে জনসমুদ্র জমে, তার কেন্দ্রে থাকে এক খেলা—বলীখেলা। বাইরে থেকে দেখলে এটি কুস্তির মতো মনে হলেও, এর ভেতরে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রতিরোধের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা।
এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ৩০০ শতাধিক খুঁটি দিয়ে তৈরি মঞ্চে শুরু হয়েছে ১১৭তম আবদুল জব্বারের বলীখেলা। এবারের আসরে ১০৮ জন বলী অংশ নিচ্ছেন। দিন শেষে তাঁদের মধ্য থেকেই একজন উঠবেন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট নিয়ে।
খেলা শুরুর আগেই লালদীঘি মাঠ ও আশপাশ এলাকায় জড়ো হন হাজারো দর্শক। বলীদের প্রতিটি লড়াই ঘিরে তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা, করতালি আর উচ্ছ্বাস। মাঠজুড়ে যেন এক উৎসবের আবহ।
গত আসরের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার মো. শরীফ, যিনি ‘বাঘা শরীফ’ নামে পরিচিত, এবারও অংশ নিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে রিংয়ে নামছেন গতবারের রানার্সআপ মো. রাশেদ, যিনি ‘রাশেদ বলী’ নামে পরিচিত। এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এবারের ফাইনালেও তাঁদের মধ্যে জমে উঠতে পারে লড়াই।
প্রতিবছর বাংলা পঞ্জিকার ১২ বৈশাখ এই বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে এর পরিসর যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দর্শকের সমাগম। চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই আয়োজন দেখতে। কেউ আসেন বলীদের লড়াই দেখতে, কেউ বা বৈশাখী মেলা ঘুরে দেখতে।
তবে এই ধারাবাহিকতা সব সময় নির্বিঘ্ন ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একবার বন্ধ হয়ে যায় এই আয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে করোনাভাইরাস মহামারির কারণেও টানা দুই বছর বলীখেলা হয়নি। কিন্তু প্রতিবারই বিরতির পর নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছে এই ঐতিহ্যবাহী আসর।
১১৭তম এই আয়োজনকে ঘিরে লালদীঘি মাঠে চলছে তিন দিনের বৈশাখী মেলা। মেলায় বসেছে মাটির তৈরি সামগ্রী, বাঁশ ও কাঠের হস্তশিল্প, খেলনা, লোকজ অলঙ্কার এবং দেশীয় খাবারের দোকান। শিশুদের জন্য রয়েছে নাগরদোলা ও বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠ ও আশপাশ এলাকায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। স্থাপন করা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ওয়াচ টাওয়ার। পুলিশ সদস্যরা ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আবদুল জব্বার সওদাগর তরুণদের শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে এই বলীখেলার সূচনা করেন।
সময়ের পরিক্রমায় এটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
শত বছর পেরিয়েও লালদীঘির মাটিতে বলীদের এই লড়াই মানুষকে টানে। সেই টান শুধু শক্তির নয়-ইতিহাসের, শিকড়েরও।