
আপডেট ডেস্ক-
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ভয়াবহ বিমান হামলা ও স্থল অভিযান জোরদার করেছে ইসরায়েল। মঙ্গলবার একদিনে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় চালানো হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চার শিশু ও তিন নারী রয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৪০ জন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের টাইর শহরের কাছে বুরজ আল-শামালিতে ১৪ জন, কাওথারিয়াত আল-রিজে পাঁচজন, হাবুশে চারজন, মারেকেহতে ছয়জন এবং সালাতে দুজন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নাবতিয়েহ শহরে বিমান হামলার আগে বাসিন্দাদের উদ্দেশে নজিরবিহীন সতর্কবার্তা দেয় ইসরায়েলি বাহিনী। এরপরই শহরজুড়ে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, নাবতিয়েহর একটি সরকারি হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকায় হামলা চালানো হলে হাসপাতালের কয়েকটি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী মঙ্গলবার দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের অন্তত ৫০টি শহর ও গ্রামের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে তারা জানায়, দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখার বাইরেও স্থল অভিযান সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এই রেখাটি সীমান্ত থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, “স্থল অভিযানে শক্তিশালী বাহিনী অংশ নিচ্ছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে।”
অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননের যাউতার আল-শারকিয়াহ শহরে প্রবেশের চেষ্টা করা ইসরায়েলি বাহিনীকে প্রতিহত করা হয়েছে। গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, তারা ড্রোন ও রকেট হামলার পাশাপাশি সরাসরি সংঘর্ষেও জড়িয়েছে।
হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে দাবি করে, ভারী গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার আড়ালে ইসরায়েলি বাহিনী শহরটিতে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়।
পূর্ব লেবাননের মাশগারা শহরেও ভয়াবহ হামলার খবর পাওয়া গেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেখানে বিমান হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক নারী রয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন। উদ্ধারকর্মীরা এখনও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হতাহতদের খোঁজ করছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, মাশগারা এলাকায় হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ও সশস্ত্র তৎপরতাকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের শরিফা গ্রামে হামলায় রিসালা স্কাউটস অ্যাসোসিয়েশনের এক উদ্ধারকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুজন। এর ফলে চলমান সংঘাতে নিহত উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২১ জনে।
পূর্ব লেবাননের লিটানি নদীর কারাউন বাঁধের আশপাশেও একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। লিটানি রিভার অথরিটি সতর্ক করে জানিয়েছে, বাঁধে আঘাত লাগলে ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরি হতে পারে। এতে নদীর তীরবর্তী এলাকার লাখো মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে দ্বিতীয় দফা হামলার শিকার হয়ে তাদের এক সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতভর লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর ১০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে উত্তর ইসরায়েলের একটি সেনা ব্যারাকে ড্রোন হামলার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। যদিও ইসরায়েল জানিয়েছে, বিস্ফোরকবাহী কয়েকটি ড্রোন সীমান্তে পৌঁছানোর আগেই ভূপাতিত করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লেবাননে অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছি এবং নিরাপত্তা বাফার জোন শক্তিশালী করছি।”
এদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সোমবার একদিনেই লেবাননের আকাশসীমা ৯১ বার লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করেছে ইউনিফিল শান্তিরক্ষী বাহিনী, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। একই দিনে ইসরায়েলি বাহিনীর ৩৯৯টি গোলাবর্ষণ এবং হিজবুল্লাহর ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনাও রেকর্ড করা হয়েছে।
লেবাননের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে চলমান সংঘাতে দেশটিতে তিন হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই সংঘাত নতুন করে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।