
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ মাঠে যতটা উত্তেজনা ছড়িয়েছে, মাঠের বাইরের নানা ঘটনা ততটাই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বকাপকে ঘিরে বৈষম্যমূলক আচরণ, ভিসা জটিলতা এবং রাজনৈতিক কারণে অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়ায় সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নীরবতাও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
ফিফার ২০২৬ বিশ্বকাপ বিডিং নীতিমালা অনুযায়ী, আয়োজক দেশগুলো লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি, কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও স্পনসরসহ ফিফা-স্বীকৃত সব ব্যক্তির ভিসা ও প্রবেশ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করা হবে। জাতীয়তা বা রাজনৈতিক কারণে কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হবে না বলেও অঙ্গীকার ছিল।
তবে টুর্নামেন্ট শুরুর পর একের পর এক ঘটনায় সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমর আবদুল কাদির আরতানকে ঘিরে। আফ্রিকার অন্যতম সেরা এই রেফারি ফিফার নির্বাচিত ৫২ জন ম্যাচ অফিশিয়ালের তালিকায় ছিলেন। প্রথম সোমালিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে তিনি ৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান।
অভিযোগ রয়েছে, বৈধ কাগজপত্র ও ভিসা থাকা সত্ত্বেও মিয়ামি বিমানবন্দরে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে দেয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর কথিত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে তাকে তুরস্কগামী বিমানে ফেরত পাঠানো হয়।
আরতান পরে জানান, তাকে সোমালিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাব সম্পর্কে এমন সব প্রশ্ন করা হয়েছিল, যার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে ফিফা তাকে পুরো টুর্নামেন্টের ম্যাচ ফি দেওয়ার ঘোষণা দিলেও বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে তিনি বঞ্চিত হন।
একইভাবে ইরান জাতীয় ফুটবল দলও নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়ে। ভিসা জটিলতার কারণে দলটির অনেক কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজও ভিসা না পাওয়াদের মধ্যে ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অনুশীলন ক্যাম্পের অনুমতি না পাওয়ায় ইরানকে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় প্রস্তুতি নিতে হয়। ম্যাচের ঠিক আগের দিন তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পায়।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে দলটিকে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে বলা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে বিশ্রামের সুযোগ না পেয়েই খেলোয়াড়দের আবার মেক্সিকোতে ফিরতে হয়। ইরানের কোচ আমির গালেনোই এ পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে দলটিকে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার বলে মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের বিভিন্ন বিশ্বকাপে বর্ণবাদ বা দর্শকদের আচরণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো দল বা ম্যাচ অফিশিয়ালের বিরুদ্ধে এমন প্রশাসনিক পদক্ষেপ আধুনিক বিশ্বকাপের ইতিহাসে খুবই বিরল।
এসব ঘটনার পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রতিক্রিয়াও সমালোচনার জন্ম দেয়। তিনি বলেন, ফিফা সবসময় সমাধানের চেষ্টা করে, তবে কোনো দেশের সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই; তারা একটি ক্রীড়া সংস্থা মাত্র।
ফিফা সভাপতির এই বক্তব্যকে অনেকেই সংস্থাটির সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্লেষক ও ক্রীড়া সাংবাদিক রায়হান আল মুঘনি বলেন, বৈশ্বিক ক্রীড়া আসরে অংশগ্রহণকারীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা ফিফার অন্যতম দায়িত্ব। তার মতে, একজন আন্তর্জাতিক রেফারিকে বিমানবন্দর থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া বিশ্বকাপের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এমন ঘটনায় ফিফার আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
বিশ্লেষকদের অভিমত, আয়োজক দেশের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ফিফার সীমিত প্রতিক্রিয়া বিশ্বকাপের নিরপেক্ষতা, অন্তর্ভুক্তি এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।