
নিজস্ব প্রতিবেদক-
প্রায় এক দশকের অপেক্ষা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়নসংক্রান্ত নানা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন-সিইআইজেড) নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
প্রায় ৮০০ একর জমির এ বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে আনোয়ারায় প্রকল্পটির গ্রাউন্ডব্রেকিং এবং অবকাঠামো উন্নয়নকাজের উদ্বোধন করা হয়। পরে এ উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ানসহ বাংলাদেশ ও চীনের সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগে প্রকল্পটির ভিত্তি স্থাপিত হয়। তবে ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং অবকাঠামোগত পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন কারণে প্রায় এক দশক ধরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পাওয়ার পর বাস্তবায়নে নতুন গতি আসে।
বেজার তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারায় প্রায় ৭৮৩ একর সরকারি জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন এবং ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট থেকে আসবে। ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ২০ হাজার টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, জেটি সংযোগ সড়ক, চার লেনের সড়ক, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার সীমানা দেয়াল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চালু হলে রপ্তানিমুখী শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে। এখানে বস্ত্র, প্রযুক্তিনির্ভর তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, মেডিক্যাল ডিভাইস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল ও অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে উঠবে।
চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় এ শিল্পাঞ্চলের লজিস্টিক সুবিধা অত্যন্ত অনুকূল। তবে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাস্টমস ও অন্যান্য সেবা আরও সহজ ও দ্রুত করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ এবং সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে সিইআইজেড ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বিনিয়োগকেন্দ্রে পরিণত হবে।