
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বটতলী স্টেশন এলাকার ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অভিযোগ, মেয়াদোত্তীর্ণ বটতলী শহর উন্নয়ন কমিটির প্রভাবেই ফুটপাতের বিভিন্ন অংশে দোকান বসছে। এসব দোকান থেকে নিয়মিত টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক ও জামায়াত নেতা কাজী নুরুল আলম এবং সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপি নেতা ছরওয়ার আকতার বিরুদ্ধে হুমকি, প্রভাব খাটানো এবং বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তির নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী, কর্মচারীরা। এসব অভিযোগের পক্ষে অডিও ও ভিডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সরবরাহ করেছে ভুক্তভোগীরা।
সরেজমিনে বটতলী স্টেশন এলাকায় ফুটপাতের বিভিন্ন অংশে অস্থায়ী দোকান দেখা গেছে। কোথাও দোকানের পণ্য ফুটপাত পর্যন্ত রাখা হয়েছে, কোথাও বসানো হয়েছে ভ্যান ও অস্থায়ী দোকান। ফলে পথচারীদের অনেককে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। স্থানীয়দের হিসাবে, পুরো স্টেশন এলাকায় ফুটপাতে প্রায় ৩০০টি দোকান রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে প্রায় দুই হাজার মার্কেটের দোকান রয়েছে বলে জানা গেছে।
ফুটপাত থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ফুটপাতে দোকান বসাতে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। কয়েকজন ভ্যানচালক বলেন, তারা প্রতিদিন ৫০ টাকা করে দিয়ে সেখানে ব্যবসা করছেন। টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে সেখানে দোকান বসানো যায় না।
অভিযোগ রয়েছে, ফুটপাতের দোকান থেকে মোহাম্মদ সেলিম নামের এক ব্যক্তি এবং মার্কেটের দোকান থেকে জামশেদ নামের আরেক ব্যক্তি টাকা আদায় করেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি।
মার্কেটের সামনে স্থায়ীভাবে বসা দোকানগুলোর কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। পাশাপাশি শহর উন্নয়ন কমিটির নামে ৫০ থেকে ৭০ টাকা আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের পক্ষে ভিডিও বক্তব্য প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে।
বটতলী স্টেশনের ব্যাংক এশিয়া থেকে এস আলম কাউন্টার পর্যন্ত এলাকায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কাছ থেকেও নিয়মিত টাকা নেওয়া হয়। সন্ধ্যার দিকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে মাছ ও কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা সেখানে এসে বসেন। এতে সড়কের একটি অংশ দখল হয়ে যায়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কীভাবে ফুটপাত ব্যবস্থাপনার নামে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কমিটির বৈধতা, অর্থ আদায়ের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সারি
ফুটপাত দখলের পাশাপাশি বটতলী স্টেশনের লোহাগাড়া-দরবেশহাট ডিসি সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, জনতা ব্যাংক থেকে ফোরকান টাওয়ার পর্যন্ত প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি অটোরিকশা সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এতে যানজট তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় পথচারী রেহেনা আক্তার বলেন, ফুটপাত সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য। কিন্তু দোকানপাটের কারণে অনেক জায়গায় হাঁটার সুযোগ নেই। চলাচলের সময় অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে গায়ে ধাক্কা লাগে। সরকারের দেওয়া জায়গা তাঁরা ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারছেন না। প্রশাসনের উচিত সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
কমিটির কার্যালয় দখলের অভিযোগ
কাজী নুরুল আলমের বিরুদ্ধে বটতলী শহর উন্নয়ন কমিটির নেতৃত্ব পাওয়ার পর প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ২৪ সদস্যের একটি পরিচালনা কমিটি প্রকাশ করা হয়। এর আগে প্রকাশিত ২১ সদস্যের কমিটিতে কাজী নুরুল আলমের নাম ছিল না। পরে তাঁকে আহ্বায়ক ঘোষণা করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নেতৃত্বে স্টার সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় অবস্থিত বণিক সমিতির কার্যালয় দখল করা হয়। কার্যালয়ের সাইনবোর্ডে এখনো বণিক সমিতির নাম থাকলেও সেখানে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন সমিতির এক সদস্য।
ওই সদস্যের অভিযোগ, কার্যালয় দখলের প্রতিবাদ করায় তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরে ২০২৪ সালের জুলাই-সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় মার্কেটের একজনকে আসামি করা হয় এবং অন্যদেরও ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
ট্রাফিক বক্সে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
লোহাগাড়ার ট্রাফিক বক্সের দায়িত্বশীলদের ওপরও কাজী নুরুল আলম প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক সদস্য।
ওই সদস্যের ভাষ্য, একদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় একটি গাড়ি আটক করা হয়। পরে তৎকালীন ট্রাফিক পরিদর্শক হাসানুজ্জামান হায়দারকে ফোন করে কাজী নুরুল আলম নিজের পরিচয় দেন শহর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে। গাড়িটির কাগজপত্র না থাকায় মামলা দেওয়া হলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাফিক বক্সে উপস্থিত হন বলে অভিযোগ।
ওই ট্রাফিক সদস্যের দাবি, সেখানে উপস্থিত দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে কাজী নুরুল আলম বলেন, তাঁর কথা কেন রাখা হয়নি, তার জবাব দিতে হবে। একপর্যায়ে তিনি বলেন, সেখানে দায়িত্ব পালন করতে হলে তাঁদেরও তাঁর নির্দেশ মানতে হবে। ঘটনাটি ৫ মে রাত ৭টা ১৪ মিনিটে ঘটেছে বলে ওই সদস্য দাবি করেন। এ-সংক্রান্ত ১০ মিনিটের ভিডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া বটতলী স্টেশনের ময়লা অন্যত্র ফেলার জন্য বিনা মূল্যে গাড়ির ব্যবস্থা করতে পুলিশ বক্সের দায়িত্বশীলদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে।
ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের অভিযোগ
এক প্রবাসীর অভিযোগ, তাঁর নামে দোকানের মূল কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কাজী নুরুল আলম তাঁর ভাইয়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁকে আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করার কথা বলে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন ওই প্রবাসী। এ-সংক্রান্ত রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে।
কমিটির দায়িত্ব পালনকারী এক কর্মচারীর অভিযোগ, কাজী নুরুল আলম তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং নির্ধারিত দায়িত্বের চেয়ে বেশি কাজ করতে চাপ দেন। এতে তাঁরা মানসিক চাপে থাকেন বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মচারী।
গত সেপ্টেম্বর মাসে বটতলী স্টেশনের পুরোনো সাউন্ড হেলথ হাসপাতালের পাশে হাজি বিরিয়ানি দোকানের সামনে একটি পচা কুকুর পড়ে থাকার ঘটনাতেও অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কুকুরটি সরানোর জন্য দোকানদারের কাছে এক হাজার টাকা দাবি করেন কমিটির সদস্যসচিব সরওয়ার কামাল। দোকানদার টাকা দিতে অপারগতা জানালে তাঁর সঙ্গে সরওয়ার কামালের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে এ ঘটনা নিয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গেও তাঁর বাক্বিতণ্ডা হয় বলে জানা গেছে।
ফুটপাত দখল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর এক স্থানীয় সাংবাদিককে মুঠোফোনে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে কাজী নুরুল আলমের বিরুদ্ধে। ওই সাংবাদিকের দাবি, তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করার পাশাপাশি মারধরের হুমকিও দেওয়া হয়।
নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা
বটতলী শহর পরিচালনা কমিটির নির্বাচন নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। গত ১৭ জুন কমিটির আহ্বায়ক কাজী নুরুল আলম ও সদস্যসচিব সরওয়ার আকতারের স্বাক্ষরে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একটি আবেদন জমা দেওয়া হয়। এতে নির্বাচনের জন্য ভোটার নীতিমালা প্রণয়ন, তফসিল ও ভোটের তারিখ ঘোষণার অনুরোধ জানানো হয়।
তবে ওই আবেদনের পর মার্কেটের ব্যবসায়ী সদস্যদের কাছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নিয়ে ফরম বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, নির্বাচনের নামে ফরম বিক্রি করা হলেও পরবর্তী কার্যক্রমে অগ্রগতি নেই। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান কমিটি নির্বাচন আয়োজনের চেয়ে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে বেশি ব্যস্ত।
ব্যবসায়ীরা একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কমিটির বৈধতা ও কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নের অবসান ঘটাতে নির্বাচন আয়োজন এবং ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।