রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসাকে নির্মম হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এক সপ্তাহের মধ্যে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ফরেনসিক ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পুলিশের হাতে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
শনিবার (২৩ মে) রাতে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার বলেন, “রামিসা হত্যা মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন জমা দিতে আমরা জোরালোভাবে কাজ করছি।
পুলিশ সূত্র জানায়, নিহত শিশুর ময়নাতদন্তের সময় তার শরীর থেকে ডিএনএ পরীক্ষা, হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াব (ধর্ষণের আলামত পরীক্ষা) এবং কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস বা ভিসেরা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ল্যাবে এসব নমুনা পরীক্ষা শেষে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়।
পরে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত রিপোর্ট পুলিশের কাছে জমা দেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজও প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। মামলায় সাক্ষী হিসেবে থাকবেন মরদেহ উদ্ধারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা, তদন্তকারী কর্মকর্তা, ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী এবং পালানোর সময় আসামিকে দেখেছেন—এমন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাও।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, “রুমের ভেতরে কীভাবে মরদেহ পাওয়া গেছে, কীভাবে তা উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে—এসব বিষয়ে যারা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের সাক্ষ্য মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।”
সূত্র আরও জানায়, সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যুর আগে শিশুটি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষার অনুরোধ করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ফরেনসিক চিকিৎসক প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেন। পরে সব পরীক্ষার ফলাফল যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়। সেখানে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে মরদেহের অবস্থার বিস্তারিত বিবরণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, আসামির বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় নিশ্চিত করার মতো প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ইতোমধ্যে প্রস্তুত রয়েছে।
এর আগে গত বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন গ্রেপ্তার আসামি সোহেল রানা। জবানবন্দিতে তিনি জানান, ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসাকে কৌশলে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে যৌন নির্যাতনের পর অচেতন হয়ে পড়লে গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে খণ্ডবিখণ্ড করে খাটের নিচে ও একটি বড় বালতির মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়।
জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান।
নিহত রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ঘটনার দিন সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাকে খুঁজতে শুরু করে পরিবার। একপর্যায়ে আসামিদের কক্ষের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ হয় পরিবারের সদস্যদের। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তারা মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করেন।
ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্না আক্তারকে আটক করে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, “আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং অন্যান্য আলামত পুলিশের হাতে রয়েছে। প্রয়োজনে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও শিশুটির মাকেও আদালতে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হবে।”