আপডেট ডেস্ক
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার মধ্যে সুপার এল নিনোর কারণে আগামী ছয় মাসে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে অতিরিক্ত গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৬০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। দেশের খুলনা, বরিশাল, ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রাণহানির ঝুঁকি বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের এক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপার এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। এ ছাড়া নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশেও তীব্র গরমের প্রভাব পড়তে পারে। ভারতে ১৫ হাজারের বেশি এবং পাকিস্তানে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা আগে থেকেই বাড়ছে। এর মধ্যে সুপার এল নিনোর প্রভাব তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি এ পরিস্থিতির কারণে খরা, দাবানল ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে, যা আরও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
প্রতিবেদনে বর্তমান তাপমাত্রার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রাণহানির হিসাব করা হয়েছে। তবে তীব্র তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি ২০২৭ সালের জুন বা জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
রেকর্ড গড়তে পারে এল নিনো
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের তুলনায় ৩ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ০২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
সাধারণত বছরের শেষ দিকে বা শীতের শুরুতে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই এর তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিবেদনের সহলেখক অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোনের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যুর হিসাবটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এত বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা মানুষের জীবনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।
খাদ্যসংকটের ঝুঁকিও বাড়তে পারে
সুপার এল নিনোর প্রভাবে শুধু তাপজনিত মৃত্যুই নয়, খাদ্যসংকটও বাড়তে পারে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গত আগস্টে সতর্ক করে বলেছিল, এর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ চরম খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতিহাসে ১৮৭৭-১৮৭৮ সালের ভয়াবহ এল নিনোর সময় ভারত, ব্রাজিল ও চীনসহ বিভিন্ন দেশে তীব্র খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ওই সময় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবী আগে থেকেই উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।
আগাম প্রস্তুতির তাগিদ
সম্ভাব্য প্রাণহানি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, তাপমাত্রার সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসের পাশাপাশি জনসাধারণের জন্য শীতল আশ্রয়কেন্দ্র বা কুলিং সেন্টার তৈরি করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া প্রচণ্ড গরমের সময় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর্মী প্রস্তুত রাখা এবং খোলা মাঠে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।