• ঢাকা |

সাইবার হামলার শঙ্কায় ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ, তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সাইবার হামলার আশঙ্কায় বাংলাদেশের কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হয়নি এবং বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনে কোনো ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গত বৃহস্পতিবার থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়। পরে পর্যায়ক্রমে ওয়েবসাইটগুলো চালু করা হয়েছে। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তার কারণে যেসব ব্যাংক ওয়েবসাইট বন্ধ রেখেছে, সেগুলো প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে চালু করা হবে। বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনেও কোনো ঝুঁকি নেই।

তবে সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় একাধিক ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার ঘটনায় দেশের আর্থিক খাতের অনলাইন অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংকগুলো কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে এবং ওয়েবসাইট পুনরায় চালুর আগে কীভাবে ঝুঁকি যাচাই করা হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

রক্ষণাবেক্ষণের কথা জানাল দুই ব্যাংক

রোববার দুপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ও বেসরকারি বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে গিয়ে রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি দেখা যায়। তবে ব্যাংক দুটি ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার কারণ হিসেবে সরাসরি সাইবার হামলার কথা উল্লেখ করেনি।

জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ‘সিস্টেম মেইনটেন্যান্স’ শিরোনামের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্যাংকের অ্যাপ্লিকেশনে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলছে। শিগগিরই সেবা চালু করা হবে। সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ব্যাংকটি।

অন্যদিকে বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ‘ইমপর্ট্যান্ট নোটিস: সার্ভিস মেইনটেন্যান্স’ শিরোনামের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ওয়েবসাইটের সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সেবা চালুর কাজ চলছে। প্রয়োজনে ১৬৭৯৬ নম্বরে ফোন করে অথবা নির্ধারিত ই-মেইলে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়।

ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় গ্রাহকেরা অনলাইনে ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন তথ্য ও ওয়েবসাইটভিত্তিক সেবা নিতে পারছিলেন না। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার কারণে ব্যাংক দুটির মূল সার্ভার আক্রান্ত হয়েছিল—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মূল সার্ভার হ্যাকের খবর নাকচ জনতা ব্যাংকের

রোববার বিকেলে পাঠানো এক বার্তায় জনতা ব্যাংক জানায়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালে ব্যাংকটির ওয়েবসাইট সাইবার হামলার শিকার হয়েছে বা হ্যাক হয়েছে—এমন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে ব্যাংকটির মূল সার্ভার হ্যাক বা সাইবার হামলার শিকার হওয়ার খবর সঠিক নয়।

ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় দুটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এনিসা (ইএনআইএসএ) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সতর্কবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে।

এর অংশ হিসেবে গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার থেকে সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানায় ব্যাংকটি।

ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার বিষয়টিকে সাইবার হামলার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয় বলেও উল্লেখ করে জনতা ব্যাংক। এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ

সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটও বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিন দিন পর রোববার সকাল ৮টা থেকে ওয়েবসাইটটি আবার চালু করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছিলেন, ওয়েবসাইটে কোনো ত্রুটি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। বিশ্বব্যাপী সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঝুঁকি কেটে যাওয়ায় সেটি আবার চালু করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়াও অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও এসবিএসি ব্যাংকের ওয়েবসাইট একই সময়ে বন্ধ রাখা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববারের মধ্যে এসব ওয়েবসাইটও চালু করা হয়।

ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও গত তিন দিনে ব্যাংকগুলোর ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন স্বাভাবিক ছিল বলে জানা গেছে। গ্রাহকদের লেনদেনে বিঘ্ন ঘটার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকা এবং ডিজিটাল লেনদেন স্বাভাবিক থাকার বিষয় দুটি আলাদা। কোনো ব্যাংকের সাধারণ ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও তার ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু থাকতে পারে। একইভাবে ওয়েবসাইট চালু থাকলেই সব ধরনের সাইবার ঝুঁকি দূর হয়েছে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।

পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ

ইন্টারনেটে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি দিয়ে বিশ্বের অসংখ্য ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবা তৈরি ও পরিচালনা করা হয়। এ ভাষায় গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, ই-কমার্স ও সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ড. তৈয়বুর রহমান জানিয়েছেন, পিএইচপির নিরাপত্তাত্রুটি নিয়ে আগাম সতর্কতা পাওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর ফলে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানো গেছে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট পর্যায়ক্রমে সচল করা হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকায় ভূমিসেবার ওয়েবসাইট চালুর ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শনাক্ত না হওয়া কিছু নিরাপত্তা দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছেন। ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা ওপেনএআইয়ের ‘প্যাচ দ্য প্ল্যানেট’ কর্মসূচির আওতায় এসব দুর্বলতা শনাক্ত করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও মূল সার্ভার হ্যাক হওয়ার তথ্য নাকচ করেছে জনতা ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকও জানিয়েছে, বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনে কোনো ঝুঁকি নেই। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, নিয়মিত হালনাগাদ এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।