• ঢাকা |

আস্থার সংকটে অস্থির পুঁজিবাজার, এক সপ্তাহে কমেছে ২ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার মূলধন


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক
সপ্তাহের শেষ দুই কার্যদিবসে সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও দেশের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা কাটেনি। সপ্তাহজুড়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই ও সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির সূচকে বড় পতন দেখা গেছে। এতে বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট ও সামগ্রিক দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠেছে।
ডিএসইর সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সপ্তাহ শেষে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১ দশমিক ০১ শতাংশ কম। তবে বড় মূলধনি ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে।
অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস কমেছে ১ দশমিক ২১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে ছোট ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির সূচক ডিএসএমইএক্সে। সপ্তাহজুড়ে সূচকটি কমেছে ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
সূচকের পাশাপাশি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমে যাওয়াও বাজারের দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে ২৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বিপরীতে দাম বেড়েছে ৮১টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৪টির। অর্থাৎ প্রধান সূচকের পতন তুলনামূলক সীমিত থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই প্রবণতা দেখা গেছে। সপ্তাহজুড়ে সেখানে ২২০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে ৬৩টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৪টির দাম। দুই বাজারেই দরপতনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি থাকায় শেষ দিকের সূচক বৃদ্ধি বাজারের সামগ্রিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
লেনদেন থাকলেও কমেছে মূলধন
ডিএসইতে সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৭৮২ কোটি টাকার বেশি। দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ৫৫৬ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের পরিমাণ থাকলেও বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়নি। কারণ, লেনদেনের পাশাপাশি কতটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে বা কমেছে, তা বাজারের প্রকৃত অবস্থা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
সপ্তাহজুড়ে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই বাজার মূলধন কমেছে। তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে তা নেমে আসে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ২ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে সিএসইর বাজার মূলধন আগের সপ্তাহের ১৩৮ কোটি টাকা থেকে কমে সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ৭৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে বাজারটির মূলধন কমেছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। তবে সিএসইর বাজার মূলধনের এই পরিসংখ্যান যাচাই করা প্রয়োজন।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ১১ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট বেড়েছে। তবে শুধু এক দিনের সূচক বৃদ্ধি দিয়ে বাজারের দুর্বলতা কাটার প্রমাণ পাওয়া যায় না। একই দিনে লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সূচকের সাময়িক উত্থান নতুন করে ক্রয়চাপ তৈরির ফল, নাকি নির্দিষ্ট কয়েকটি শেয়ারের দরবৃদ্ধির কারণে হয়েছে, তা বুঝতে পরবর্তী কার্যদিবসগুলোর লেনদেন ও দরপরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
কিছু শেয়ারে বড় উত্থান, পতনও উল্লেখযোগ্য
সপ্তাহজুড়ে সামগ্রিক দরপতনের মধ্যেও ডিএসইতে কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। এর মধ্যে এপেক্স ফুডসের শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ল্যাম্পসের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ এবং আজিজ পাইপসের ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সিএসইতেও এপেক্স ফুডসের শেয়ারের দাম প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে দরপতনের তালিকায় ছিল কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ড ও কোম্পানি। ডিএসইতে ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের দাম কমেছে ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সিএসইতে তহবিলটির দরপতন হয়েছে ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে সিএসইতে সাইফ পাওয়ারটেকের শেয়ারের দাম কমেছে ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ।
একই সপ্তাহে কিছু শেয়ারের বড় দরবৃদ্ধি এবং অন্যগুলোর উল্লেখযোগ্য দরপতন বাজারে অভিন্ন প্রবণতার পরিবর্তে কোম্পানিভেদে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
সিএসইতে সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। শ্রেণিভিত্তিক লেনদেনে ‘এ’ শ্রেণির কোম্পানির অংশ ছিল ৭৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে ‘জেড’ শ্রেণির কোম্পানির অংশ ছিল ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে কোনো শ্রেণির কোম্পানিতে লেনদেনের অংশ বেশি হলেই সেগুলোর আর্থিক ভিত্তি বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা জরুরি। সূচকের স্বল্পমেয়াদি উত্থানকে বাজারের স্থায়ী পুনরুদ্ধার হিসেবে বিবেচনা করার আগে দরবৃদ্ধিকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, লেনদেনের ধারাবাহিকতা এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধি ও দরপতনের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ঘোষণা, আর্থিক প্রতিবেদন এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সামগ্রিকভাবে সপ্তাহের শেষ দিকে সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা স্বস্তি দিলেও অধিকাংশ শেয়ারের দরপতন এবং ছোট ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির সূচকের বড় পতন বাজারের দুর্বলতাই প্রকাশ করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এক-দুই দিনের সূচক বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতা, বাজারে বিস্তৃত অংশগ্রহণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার উন্নতি।