নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে দুর্বল হচ্ছে বাংলাদেশি টাকা। আন্তঃব্যাংক, স্পট ও খোলাবাজার—সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে ডলারের দাম। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা থেকে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরে এসব ডলার বিক্রি করা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর মোট চাহিদা ছিল ৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বিক্রি করা ডলারের পরিমাণ ছিল অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৪ টাকা ২২ পয়সায়। একই দিনে স্পট মার্কেটে প্রতি ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৪ টাকা ৩৫ থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সায়। অথচ ১৫ দিন আগেও স্পট মার্কেটে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন ও ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রতি ডলারের বিপরীতে দিতে হচ্ছে ১২৪ টাকা ২১ পয়সা। মাসের শুরুতে এ দর ছিল ১২৩ টাকা ১১ পয়সা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম বেড়েছে ১ টাকা ১০ পয়সা।
ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি খোলাবাজারেও ডলারের দাম বেড়েছে। রাজধানীর মতিঝিলের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার খোলাবাজারে প্রতি ডলার কিনতে হয়েছে ১২৮ থেকে ১২৮ টাকা ২০ পয়সায়। আর গ্রাহকদের কাছ থেকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে মানি এক্সচেঞ্জগুলো দিয়েছে ১২৭ টাকা ৭০ থেকে ১২৭ টাকা ৮০ পয়সা। অথচ এক মাস আগেও খোলাবাজারে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১২৬ টাকা ২০ পয়সার মধ্যে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। ফলে জ্বালানি তেল, সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির বিল পরিশোধে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই বাড়তি ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে।
এ ছাড়া রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি থাকায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। মাসের শেষ দিকে প্রবাসী আয় তুলনামূলক কম আসা এবং বড় অঙ্কের বৈদেশিক লেনদেনের কারণেও ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকারদের তথ্যমতে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স হাউসগুলোর কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার প্রস্তাব পাচ্ছিল। কয়েকটি ব্যাংক ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা দরেও ডলার কিনেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রির পর রেমিট্যান্স হাউসগুলো আরও কম দামে ডলার বিক্রির প্রস্তাব দেয়।
ব্যাংকাররা জানান, ৩০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক পেমেন্ট থাকায় বাজারে চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বৈদেশিক দায় পরিশোধের প্রয়োজনীয়তাও ডলারের চাহিদা বাড়িয়েছে।
একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকগুলোতে ডলারের চাহিদা রয়েছে এবং চলতি মাসে আরও কয়েকটি বড় অঙ্কের বৈদেশিক পেমেন্ট রয়েছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করলে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। আরও কয়েক দফা ডলার বিক্রি করা হলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে মোট ১৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে চলতি অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনে প্রবাসীরা দেশে ২৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
ডলারের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে পারে দেশের আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজারেও। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে পড়াশোনা, চিকিৎসা ও ভ্রমণের প্রয়োজনে ডলার কিনতে সাধারণ মানুষকে আগের চেয়ে বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।