• ঢাকা |

ভারতের স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি, অল্পের জন্য রক্ষা পেল বাংলাদেশের বিএস-১


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক

মহাকাশে ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকিতে পড়েছিল বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। তবে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দ্রুত হিসাব-নিকাশ ও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় স্যাটেলাইটটি। গত ১৩ আগস্ট ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) প্রকৌশলীরা গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেন। স্যাটেলাইটটির অবস্থান, ধ্বংসাবশেষের গতিপথ ও সম্ভাব্য সংঘর্ষের আশঙ্কা বিশ্লেষণ করে তাঁরা এর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন আনেন। এতে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।

বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান জানান, গত ৮ থেকে ৯ আগস্টের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম স্পেস-ট্র্যাক থেকে এ বিষয়ে সতর্কবার্তা পান তাঁরা। পরে ধ্বংসাবশেষটির গতিপথ ও বিএস-১-এর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ধ্বংসাবশেষটি ছিল ভারতের প্রথম দিককার যোগাযোগ উপগ্রহ ইনস্যাট-১এ-এর একটি অংশ। ১৯৮২ সালে উৎক্ষেপণের পর স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। দীর্ঘদিন পরও এর ধ্বংসাবশেষ মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা সক্রিয় স্যাটেলাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইমাদুর রহমান বলেন, মহাকাশে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ও পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ ভেসে বেড়ায়। এসব বস্তুর কোনোটি সক্রিয় স্যাটেলাইটের কাছাকাছি চলে এলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। বিএসসিএল স্পেস-ট্র্যাকের সদস্য হওয়ায় এ ধরনের ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি জানান, সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রকৌশলীরা ধ্বংসাবশেষটির সম্ভাব্য গতিপথ এবং বিএস-১-এর সঙ্গে এর ন্যূনতম দূরত্ব নির্ধারণে বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ করেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামান্য ভুলও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই পুরো প্রক্রিয়ায় সতর্কতার সঙ্গে তথ্য যাচাই করা হয় এবং স্পেস-ট্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই ঝুঁকি মোকাবিলা

এ ঘটনায় উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিএস-১ নির্মাণকারী ফরাসি প্রতিষ্ঠান থালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের সহায়তা ছাড়াই বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গাজীপুরের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই স্যাটেলাইটটির গতিপথ বিশ্লেষণ, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কক্ষপথ পরিবর্তনের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

বিএস-১ ২০১৮ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর প্রথম তিন বছর স্যাটেলাইটটি পরিচালনায় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা সহায়তা করেন। পরে ২০২১ সাল থেকে বিএসসিএল স্যাটেলাইটটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়।

ইমাদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও বর্তমানে বিএসসিএল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক এ ঘটনা বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের নিজস্ব সক্ষমতা ও মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনায় দক্ষতার বিষয়টি তুলে ধরেছে।

মহাকাশ বর্জ্য নতুন উদ্বেগ

বিএস-১-এর জন্য মহাকাশ বর্জ্যের কারণে ঝুঁকি তৈরির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ২০২১ সালেও স্যাটেলাইটটি একই ধরনের সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।

বিশ্বজুড়ে মহাকাশে সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি পুরোনো স্যাটেলাইট, রকেটের অংশ এবং অন্যান্য বর্জ্যও জমছে। এসব বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষ হলে কার্যকর স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগসেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ কারণে মহাকাশে বর্জ্যের গতিপথ পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের বিষয়ে আগাম সতর্কতা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিএস-১-এর ক্ষেত্রে সময়মতো সতর্কবার্তা, যথাযথ বিশ্লেষণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা এড়ানো গেছে।

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বিএস-১-এর নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করতে মহাকাশ বর্জ্য পর্যবেক্ষণ এবং নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।