• ঢাকা |

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, প্যারিসে সংঘর্ষে গ্রেপ্তার প্রায় এক হাজার


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

আপডেট  ডেস্ক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের একপর্যায়ে রাজধানী প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়।

বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের জন্য এই বিক্ষোভ নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ অংশ নিচ্ছেন।

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। তবে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ। প্যারিসে মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নিলেও সিজিটির দাবি, সেখানে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার।

প্যারিসে সংঘর্ষ, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরুতে শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে পূর্ব প্যারিসে মিছিলের নির্ধারিত সমাপ্তিস্থলের কাছে মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।

পুলিশ মাইকে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার আহ্বান জানায়। এ সময় কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার ছুড়ে মারায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে দিগ্‌বিদিক ছুটতে থাকেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, গত সপ্তাহের মতো ব্যাপক লুটপাট ও দোকানপাটে ভাঙচুর ঠেকাতে এবার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি হেলিকপ্টার, সাঁজোয়া যান ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়। তাঁর দাবি, এ পদক্ষেপের ফলে বড় ধরনের সহিংসতা ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে ২৮৯টি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে কয়েকটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। মার্সেই ও লিওঁ শহরের বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। লিওঁ, ক্লেরমঁ-ফেরঁ, স্ত্রাসবুর্গ ও বোর্দো শহরে কাঁদানে গ্যাস এবং নিস ও নঁতে শহরে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ।

নিস শহরের কেন্দ্রস্থলে কট্টর ডানপন্থিদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ।

ম্যাক্রোঁ সরকারের ওপর বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে অর্থায়ন বাড়ানো এবং শিক্ষক ও কর্মীসংকট নিরসনের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ফ্রান্সজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ।

আগামী বছরের মে মাসে ভোটাররা ম্যাক্রোঁর উত্তরসূরি নির্বাচন করবেন। তাঁর প্রেসিডেন্ট মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এই আন্দোলন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র‌্যালি পার্টি অভিযোগ করেছে, ম্যাক্রোঁর সরকার জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে কট্টর বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং পুলিশের দমন-পীড়নের সমালোচনা করেছেন।

বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের অভিযানে কয়েকজন কিশোর দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর শারীরিক আঘাত পেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছোট আন্দোলন থেকে জাতীয় বিক্ষোভ

গত মাসে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মীসংকটের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেন। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ শ্রমজীবী মানুষও আন্দোলনে শামিল হন।

প্যারিসে ৪৬ বছর বয়সী শিক্ষিকা বেনেডিক্ট পিতিওঁ তাঁর ১৬ বছর বয়সী মেয়ে গারঁসকে নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। পিতিওঁ বলেন, তরুণদের দাবির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। একজন অভিভাবক ও শিক্ষিকা হিসেবে তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

আগের সপ্তাহের সহিংসতার দৃশ্য দেখে ভয় পেলেও বিক্ষোভ থেকে সরে দাঁড়াতে চাননি গারঁস। তাঁর মতে, ভয়ে আন্দোলন থেকে দূরে থাকলে তা সরকারের জন্য জয় বয়ে আনত।

শুক্রবার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঘোষণা না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে তাঁরা।

বৈষম্য ও বেকারত্ব নিয়েও ক্ষোভ

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ম্যাক্রোঁর শাসনামলে দারিদ্র্য ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

২৭ বছর বয়সী ক্যামিল শেনিয়ে জানান, প্রকৌশলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও তিনি চাকরি পাননি। তাঁর ভাষ্য, তাঁর মতো অনেক মানুষ কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে রাস্তায় কিংবা পরিত্যক্ত ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন সিজিটির সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, প্যারিসের কেন্দ্রস্থল এড়িয়ে শহরের প্রান্তে মিছিল করার অনুমতি দিয়ে কর্তৃপক্ষ আন্দোলন সীমিত করার চেষ্টা করছে। বিক্ষোভের কারণে ল্যুভরসহ রাজধানীর কয়েকটি প্রধান জাদুঘরও বিশেষ ব্যবস্থায় বন্ধ রাখা হয়েছিল।

তবে বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।