নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজনৈতিক কারণে বাধ্য হয়ে ১৭ বছর বিদেশে থাকতে হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় পরিচয় নয়, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষের জন্য রাষ্ট্রকে সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, “আমি একজন মুসলমান। আমাকে রাজনৈতিক কারণে বাধ্য হয়ে ১৭ বছর বিদেশে থাকতে হয়েছিল। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে আমি হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু এই দেশের ওপর আপনার যে অধিকার আছে, এই দেশের ওপর আমারও সেই অধিকার আছে। এই রাষ্ট্র আপনাকে যা দেবে, আমাকেও তা-ই দেবে।”
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছিলেন। সেই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন এবং অনেকে শহীদ হয়েছিলেন। তখন কেউ মানুষের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করেননি। সবাই দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে। গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও ছাত্র-জনতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা রাজপথে নেমে এসেছেন। মানুষের কথা বলার অধিকার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কেউ সহযোদ্ধাদের ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাননি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, ওই বছরের জুলাইয়ে দেশের মানুষ ও ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারকে বিদায় করেছেন। সারাদেশের লাখ লাখ মানুষ সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। মা-বোন, শিশু, তরুণ-যুবকসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সেখানে কারও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, স্বৈরাচার ক্ষমতায় টিকে থাকতে গুলি চালিয়েছে। এতে অনেকে শহীদ হয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করেননি। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিটি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ নাকি খ্রিষ্টান—তা বিবেচনা না করেই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার, এই দেশ আমাদের সবার।” ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে ধর্মের মানুষই হোন না কেন, বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে সবাই এ দেশের নাগরিক। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ই সবার অভিন্ন পরিচয়।
একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের সবার লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ শান্তিতে বসবাস করবে এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রেখে চলবে।
তিনি বলেন, “আসুন না, আমরা সবাই মিলে সেই বাংলাদেশটি, প্রত্যাশিত বাংলাদেশটি গড়ে তুলি, যেই বাংলাদেশের জন্য দল, মত, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন সময়ে অকাতরে আমরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছি।”
প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সবার সহযোগিতা চান। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান—সবার সহযোগিতা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
বক্তব্যের শেষে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে উপস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরীসহ সরকারের প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সংসদ সদস্য ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
এর আগে মঙ্গলবার সকালে ও দুপুরে রংপুর ও রাজশাহীতে শারদীয় দুর্গাপূজার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে রাতে চট্টগ্রাম নগরের জেএম সেন হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি।