নিজস্ব প্রতিবেদক-
টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু, প্রায় ৯ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন ৩৭ হাজারের বেশি মানুষ। পাশাপাশি কৃষি, সড়ক ও রেল যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানিয়েছে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়।
চট্টগ্রাম: টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং একের পর এক পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগের জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ, বিচ্ছিন্ন হয়েছে বহু এলাকা। প্রাণহানি, বসতবাড়ি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়।
বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—এই পাঁচ জেলায় এখন পর্যন্ত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জন।
মৃতদের মধ্যে চট্টগ্রামে ১১ জন, কক্সবাজারে ২৩ জন (এর মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা), রাঙামাটিতে ৩ জন এবং বান্দরবানে ৬ জন রয়েছেন। আহতদের মধ্যে চট্টগ্রামে ১২ জন, কক্সবাজারে ২৪ জন, খাগড়াছড়িতে ১ জন এবং বান্দরবানে ২ জন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা, যেখানে ৬ লাখ ৬২ হাজারের বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। এছাড়া কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে ৩৪ হাজার ৪১৭ জন এবং বান্দরবানে ৮ হাজার ৩৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় পাঁচ জেলায় মোট ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৫৫ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ২২ হাজার ৬০০ জন, কক্সবাজারে ২ হাজার ৯৭৪ জন, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৮২০ জন, খাগড়াছড়িতে ২ হাজার ৯১৬ জন এবং বান্দরবানে ৪ হাজার ৭৪৫ জন রয়েছেন।
সরকার ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত পাঁচ জেলায় ১ হাজার ৯১ দশমিক ৬ মেট্রিক টন চাল, ৯১ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ৩৪ হাজার ৪৭০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রান্না করা খাবার, শিশু খাদ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিনও দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বন্যায় কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, পান বরজ, আদা, হলুদসহ বিভিন্ন ফসল মিলিয়ে প্রায় ১৮ হাজার ৯৩৩ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধানে, যার ক্ষতির পরিমাণ ১২ হাজার ৭৪৩ দশমিক ১ হেক্টর। চট্টগ্রাম জেলাতেই সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়ক মিলিয়ে ২৪১ দশমিক ৩১ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব সড়ক প্রাথমিকভাবে মেরামতে প্রায় ৩৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং স্থায়ীভাবে সংস্কারে প্রায় ২১০ কোটি ২৯ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক থাকলেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে কালুরঘাট সেতুর আগে শমসেরপাড়া এলাকায় প্রায় ৪০০ মিটার রেললাইন দেড় ফুট পানির নিচে তলিয়ে থাকায় ওই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী রোববার থেকে এ পথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে।
চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আদিত্য ইসলাম অমিত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দুর্গত মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সার্বক্ষণিক তদারকি চলছে।