নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) শিশু, নারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানো (পুশ ইন) ঠেকাতে বাংলাদেশের ২৬ জেলার সীমান্তে ৬০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে একসঙ্গে এত বিজিবি সদস্য এসব সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতেন না। চার পালায় ২৪ ঘণ্টা তারা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় লোকজনও তাদের সহযোগিতা করছেন।
এদিকে গত বুধবার থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত— চার দিনে বিএসএফের ২১টি পুশ ইনের ঘটনা সফল হতে দেয়নি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এসব ঘটনার মাধ্যমে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে ৮ থেকে ১১ জুন— চার দিন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সম্মেলনে অবৈধ পুশ ইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারতের পাঁচ রাজ্যের সঙ্গে দেশের ২৬ জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে ৪ হাজার ৪৮৭ কিলোমিটার সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করতে ৬০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া সাদাপোশাকে বিজিবি সদস্যরা গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছেন।
বিজিবির সদর দফতর সূত্র জানায়, ২৬ জেলার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পুশ ইনের চেষ্টা করা হতে পারে, সেগুলো চিহ্নিত করে সেসব স্থানে বিজিবির টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, ফেনী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, কুমিল্লা, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও শেরপুর।
এরআগে, বিজিবি জানায়, সর্বশেষ গতকাল মেহেরপুরে তেঁতুলবাড়িয়া, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরের মশালগাঁও ও দিনাজপুরের বিরামপুর সীমান্ত দিয়ে যথাক্রমে ৭ জন, ১১ জন ও ৫ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছিল বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের কঠোর অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি। এ ছাড়া ৩ জুন থেকে পৃথক ১৮টি ঘটনায় বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের ১৮৬ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা ঠেকিয়ে দেয় বিজিবি।
বিজিবি ও কয়েকটি সীমান্ত সূত্র জানায়, পুশ ইন করার জন্য সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় শিশু, নারী ও পুরুষ জড়ো করছে বিএসএফ। বিএসএফ তাদের পুশ ইন করতে ব্যর্থ হয়ে আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে অধিকাংশ ব্যক্তিকে ভারতে ঢুকতে দিচ্ছে না। তারা খোলা আকাশে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৪৮৭ কিলোমিটার সীমান্তের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার সীমান্ত আছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে। বাকি সীমান্ত রয়েছে ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম ও আসাম রাজ্যে। ভারত কিছু অংশে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। বেশির ভাগ অংশই অরক্ষিত।
ভারতের কেন্দ্রীয় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএসএফ পুশ ইনে বেশি তৎপর হয়েছে বলে জানা গেছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর গত ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নিয়েই তিনি ঘোষণা দেন, অবৈধ বাংলাদেশি ও অনুপ্রবেশকারী আটক করে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।
যোগাযোগ করা হলে বিজিবি সদর দফতরের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, বিজিবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থী কোনো ধরনের পুশ ইন–চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এবং ৩ জুনের পর কেউ পুশ ইন হয়নি। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে।
বিজিবি সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে বিএসএফ মোট ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছিল। এর মধ্যে ১২০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। এর পর থেকে দেশে পুশ ইনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি বিজিবির।
বিজিবি সদর দফতর জানায়, ৮ থেকে ১১ জুন নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে চার দিনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ওই সম্মেলনে অবৈধ পুশ ইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিজিবি সদর দফতরের উপমহাপরিচালক (গণমাধ্যম) কর্নেল আবুল হাসনাত মাহমুদ আজম গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে জোরপূর্বক ভারতীয় নাগরিক ও বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশ-ইন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। এ ছাড়া বিএসএফ, ভারতীয় নাগরিক বা দুষ্কৃতকারীদের দিয়ে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা, আহত ও নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হবে। এ ছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধ, মানব পাচার প্রতিরোধ, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অন্যান্য অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হবে।
পুশ ইন ছাড়াও সীমান্ত হত্যার অভিযোগ আছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান। এ ছাড়া ২০২৪ সালে ৩০ জন এবং ২০২৩ সালে ৩১ জন বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে নিহত হন।
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ কোনো ধরনের অবৈধ পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের (ফেরত পাঠানো) পক্ষে নয়। এ কারণে সীমান্তে বিজিবিকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।