• ঢাকা |

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত এলপিজি ট্যাংকার ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ উধাও


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১১ জানুয়ারী, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

 

বিশেষ প্রতিনিধি:
 

#নথিতে এখনো অবস্থান দেখালেও বাস্তবে জাহাজটির কোনো হদিস নেই

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পরিবাহী ট্যাংকার জাহাজ ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ চট্টগ্রাম বন্দরের বার্থিং লিস্টে এখনো অবস্থানরত দেখালেও বাস্তবে জাহাজটি বাংলাদেশে নেই। কবে, কীভাবে এবং কোন অনুমতিতে জাহাজটি দেশ ছেড়েছে—সে বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর কিংবা স্থানীয় এজেন্ট কেউই নিশ্চিত তথ্য দিতে পারছেন না।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর প্রায় ৪৪ হাজার টন এলপিজি নিয়ে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ওই সময় থেকেই জাহাজটিতে পরিবাহিত এলপিজির উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে ইরানি জ্বালানি পরিবহনের অভিযোগে গত বছরের ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। নিষেধাজ্ঞার সময় জাহাজটি বাংলাদেশেই অবস্থান করছিল।

তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের বার্থিং লিস্ট অনুযায়ী, জাহাজটি এখনো চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করছে এবং এতে ৪২ হাজার ৯২৪ টন এলপিজি রয়েছে। বার্থিং লিস্টে সাধারণত বন্দরে অবস্থানরত জাহাজের নাম, পণ্য, পরিমাণ, আগমনের তারিখ ও স্থানীয় প্রতিনিধির তথ্য উল্লেখ থাকে।

সম্প্রতি দেশে এলপিজি সংকট নিয়ে তথ্য পর্যালোচনার সময় বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। অনুসন্ধানে জানা যায়, বার্থিং লিস্টে নাম থাকলেও জাহাজটি বাস্তবে বাংলাদেশে নেই। এমনকি কখন জাহাজটি দেশ ছেড়েছে, সে সম্পর্কেও চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। জাহাজটির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান সিওয়েভ মেরিন সার্ভিস জানায়, তাদের অবগত না করেই জাহাজটি গত ১৫ নভেম্বরের আগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে। বর্তমানে জাহাজটির অবস্থান সম্পর্কেও তারা নিশ্চিত নয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর এলপিজি স্থানান্তরের সময় ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ ও ‘বিএলপিজি সোফিয়া’ নামের আরেকটি ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ‘বিএলপিজি সোফিয়া’ গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে। ওই ঘটনার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুটি অ্যাডমিরালটি মামলায় জাহাজটিকে আটক করা হয়। আইনি জটিলতা কাটিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর জাহাজটিকে আবার গ্যাস স্থানান্তরের অনুমতি দেওয়া হয়। এর মধ্যেই গত ৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র জাহাজটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

পোর্ট ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই দেশত্যাগ

স্থানীয় এজেন্ট সিওয়েভ মেরিন সার্ভিস জানায়, পোর্ট ক্লিয়ারেন্স (পিসি) না নিয়েই গত ১৩ নভেম্বর জাহাজটি বাংলাদেশ ছেড়ে যায়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি ২৩ নভেম্বর কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।

সিওয়েভ মেরিন সার্ভিসের জেনারেল ম্যানেজার মঈন ছিদ্দিক বলেন, ‘১৬ নভেম্বরের পর থেকে জাহাজটির কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বন্দর, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। প্রিন্সিপালকেও ই-মেইল করেছি, কিন্তু কোনো জবাব পাইনি।’

কুতুবদিয়া থানার পুলিশ জানায়, স্পিডবোটে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও জাহাজটির কোনো সন্ধান মেলেনি।

নাম ও পতাকা পরিবর্তনের রহস্য

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ তাদের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় জাহাজটির বর্তমান নাম ‘আদা’ এবং পূর্বনাম ‘ক্যাপ্টেন নিকোলাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জাহাজটির আইএমও নম্বর ৯০০৮১০৮। জাহাজ ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটগুলোর তথ্যমতে, বর্তমানে জাহাজটি বতসোয়ানার পতাকা বহন করছে এবং মালাক্কা প্রণালি হয়ে চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তবে বিভিন্ন ট্র্যাকিং সাইটে জাহাজটির নাম ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা যাচ্ছে, যা বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে।

ইরানি এলপিজি অভিযোগ

বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৪ সালে অভিযোগ ওঠার পর জাহাজটির কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ইরানি এলপিজি পরিবহনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বন্দর পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা তখন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাইনি। তবে জাহাজটি কীভাবে পিসি ছাড়াই চলে গেল, বিষয়টি উদ্বেগজনক।’