• ঢাকা |

লেবাননে ইসরায়েলি বুটের নিচে হাজার বছরের ইতিহাস, বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টানদের ক্ষোভ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ৩ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

লেবাননের মাটির প্রতিটি স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানব সভ্যতার বিবর্তনের গল্প। ফিনিশীয়, গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টাইন আর ক্রুসেডারদের পদচিহ্ন ধন্য এই ভূখণ্ডটি যেন এক জীবন্ত উন্মুক্ত জাদুঘর। তবে লেবাননের সেই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো এখন ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক আগ্রাসনের মুখে পড়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের নানামুখী উদ্বেগ আর তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির তোয়াক্কা না করেই একের পর এক প্রাচীন নিদর্শন ও ঐতিহাসিক দুর্গগুলোকে রণক্ষেত্রে পরিণত করা হচ্ছে, যা বিশ্ব ঐতিহ্যপ্রেমীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে কেবল সামরিক আধিপত্যই নয়, বরং জড়িয়ে গেছে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দাবার চাল, যা হোয়াইট হাউস থেকে ভ্যাটিকান পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম শহর নাবাতিয়ের কাছে একটি পাথুরে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গটি দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। কয়েক দিনের তীব্র লড়াই আর ভারী বোমাবর্ষণের পর এই মধ্যযুগীয় দুর্গটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ২৬ বছরের মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে এটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় এবং গভীরতম সামরিক অনুপ্রবেশ। ইসরায়েলি সৈন্যরা বর্তমানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লিতানি নদী পার হয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং জাহরানি নদীর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। এর ফলে পুরো অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্যগুলো এখন কামানের গোলার সীমার মধ্যে পড়ে গেছে।

লেবাননে বর্তমানে ছয়টি ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। এছাড়া দেশটির অন্তত ৩৯টি সাংস্কৃতিক স্থানকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সাময়িকভাবে বিশেষ বর্ধিত সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল, যার বড় একটি অংশ বর্তমান যুদ্ধ কবলিত দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এই ঐতিহ্যগুলো বাঁচানোর আকুতি জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে প্রাচীন ঐতিহাসিক টায়ার শহরসহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলের চারপাশ জুড়ে যেভাবে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে, তাতে এই অমূল্য নিদর্শনগুলো চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

রাজধানী বৈরুত থেকে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত টায়ার শহরটি ছিল প্রাচীন ফিনিশীয় সভ্যতার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও সামুদ্রিক কেন্দ্র। প্রাচীন এই শহরটি একসময় ভূমধ্যসাগরের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ঐতিহাসিক অবরোধের পর এটি মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত হয়। গ্রিক, রোমান এবং বাইজেন্টাইন শাসনামলে এই শহরের গৌরব ও সমৃদ্ধি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমান টায়ার শহরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে রয়েছে রোমান যুগের চমৎকার সব স্থাপত্য এবং রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম হিপোড্রোম বা প্রাচীন ঘোড়দৌড়ের মাঠ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ এবং এলাকা খালি করার কঠোর নির্দেশের কারণে টায়ার ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে প্রায় দুই লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। আর পুরো লেবানন জুড়ে এই সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন দশ লাখেরও বেশি মানুষ। জনশূন্য এই ঐতিহাসিক শহরটি এখন কেবলই গোলারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে।

ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন এবং ১৯৯৯ সালের দ্বিতীয় প্রোটোকল অনুযায়ী, এ ধরনের সুরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক স্থানগুলোর ক্ষতি করা আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ইউনেস্কোর সংস্কৃতি বিষয়ক শীর্ষ কর্তারাও অতীতে একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যখন কোনো দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস হয়, তখন মূলত মানুষের নৈতিক মান ক্ষুণ্ণ হয় এবং সামাজিক সংহতি বিনষ্ট হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হুমকিতে থাকা শীর্ষ ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ। এর মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে বোফোর্ট দুর্গ, যা স্থানীয়ভাবে কালাত নামে পরিচিত। লিতানি নদীর তীরে প্রায় ৭০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই ১২ শতকের ক্রুসেডার দুর্গটি তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সবসময়ই সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ক্রুসেডারদের পর ওটোমান সাম্রাজ্যসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির হাতবদল হয়ে এটি একসময় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। ১৯৮২ সালের আগ্রাসনের সময়ও ইসরায়েল এটি দখল করে এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। আজ আবারও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল। একইভাবে মাউন্ট আমেল অঞ্চলের আরও চারটি মধ্যযুগীয় দুর্গ— তিবনিন, চাকরা, দেইর কিফা এবং চামা এখন ধ্বংসের মুখে। এই দুর্গগুলো মূলত ক্রুসেডার, আইয়ুবী ও মামলুক আমলের সামরিক স্থাপত্যের অনন্য বিবর্তনের সাক্ষী বহন করছে। এই স্থানগুলোতে রোমান যুগ এবং ব্রোঞ্জ যুগেরও প্রাচীন মানব বসতির প্রমাণ পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা ।


এছাড়াও সিডনের কাছে অবস্থিত প্রাচীন এশমুন মন্দিরটি ফিনিশীয় আরোগ্যকারী দেবতা এশমুনের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত ছিল, যা প্রায় ৩.৬ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বৈরুত থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত সাইদার ঐতিহাসিক কেন্দ্রটিও ফিনিশীয়দের অন্যতম প্রধান বন্দর ছিল, যা প্রাচীনকালে কাচশিল্প, বেগুনি রং ও ধাতুশিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত ছিল। চৌফ অঞ্চলের ছিম প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় রয়েছে একটি প্রাচীন রোমান ও বাইজেন্টাইন গ্রাম, যেখানে সূর্য দেবতা হেলিওসের মন্দির ও একটি বাইজেন্টাইন ব্যাসিলিকা গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রাচীন রূপকে ফুটিয়ে তোলে। হাসবাইয়ায় অবস্থিত চেহাবি দুর্গটিতে এখনো ১২ শতকের আমিরদের বংশধররা বসবাস করছেন। আর খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা কানা গুহা, যেখানে অলৌকিকভাবে যীশু খ্রিষ্ট পানিকে আঙ্গুরের রসে পরিণত করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, তাও আজ বোমাবর্ষণের শব্দে কাঁপছে।

তবে এই যুদ্ধের সমীকরণটি কেবল ভূখণ্ডের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরান সম্প্রতি একটি প্রামাণ্য চিত্র ও ভিডিও প্রকাশ করেছে, যার মূল স্লোগান হচ্ছে 'ওয়ান ফ্রন্ট ওয়ান ফাইট' অর্থাৎ এক রণাঙ্গন, এক লড়াই। এই প্রোপাগান্ডা বা বার্তার পেছনে রয়েছে এক সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক খেলা। শত্রুরা চরম দাম্ভিকতার সাথে ঘোষণা দিয়েছিল যে ‘ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠানো হবে’, অথচ হামলা শুরুর তিন মাস পার হয়ে গেলেও ইরানকে এখনো সেই পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়নি। উল্টো সারা বিশ্ব দেখছে যে বিশাল এক পশ্চিমা জোট ও পরাশক্তির বিরুদ্ধে টিকে থেকেও ইরান কীভাবে কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ সামাল দিচ্ছে। এখন তো পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মার্কিন মধ্যস্থতায় শত্রুপক্ষ একের পর এক আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে, অথচ ইরান সেসব প্রস্তাবনা একপ্রকার অবজ্ঞাভরে নাকচ করে দিচ্ছে। উল্টো চুক্তির দ্বারপ্রান্তে এসে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননে হামলা পুরোপুরি বন্ধ না করলে তারা কোনো চুক্তিতে সই করবে না।

ইরানের এই অনড় অবস্থানে ত্যাক্ত-বিরক্ত ও চরম ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ কানাকানি ও কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে লক্ষ্য করে বলেছেন, তুমি একজন পাগল এবং অকৃতজ্ঞ... আমি এবং আমেরিকার সমর্থন না থাকলে এতদিন তোমাকে হয়তো জেলেই থাকতে হতো! সারা বিশ্ব এখন তোমাকে এবং ইসরায়েলকে ঘৃণা করে। ট্রাম্পের মতো একজন কট্টর ইসরায়েলপন্থী নেতার মুখে নেতানিয়াহুর প্রতি এমন চরম মেজাজ হারানোর নেপথ্যে কী কারণ থাকতে পারে?

এর পেছনের মূল কারণটি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের প্রধানরা যখন তাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও সামরিক পদক্ষেপকে ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা’ বলে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন ভ্যাটিকানের পোপ লিও এর তীব্র ও প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন। পোপ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ঈশ্বর কোনো সংঘাত বা রক্তপাতকে আশীর্বাদ করেন না এবং যারা অন্যায্য যুদ্ধ করে, ঈশ্বর তাদের প্রার্থনা শোনেন না। এই মন্তব্যের পর ট্রাম্প পোপ লিওকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে বসেন, যার জেরে পুরো ইউরোপ জুড়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এক বিশাল ক্ষোভের দেয়াল তৈরি হয়। সেই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে ট্রাম্প কিছুটা নতি স্বীকার করলেও, লেবানন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প ও পোপের সেই পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব গোপনে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

এর মূল কারণ হলো, হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার উছিলায় ইসরায়েল এবার সামরিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু লেবাননে ঢুকে পড়েই ক্ষান্ত হয়নি, তারা রাজধানী বৈরুতের দিকে বড় ধরনের অভিযানের রূপরেখা তৈরি করেছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, লেবাননে খ্রিষ্টধর্মের একটি দীর্ঘ, প্রাচীন ও অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস রয়েছে। পবিত্র বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, সেন্ট পিটার এবং পল ফিনিশীয়দের মধ্যে এই অঞ্চলেই প্রথম খ্রিষ্টধর্ম প্রচার করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ প্রাচীন অ্যান্টিওকের খ্রিষ্টধর্মের ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। এক হিসেবে লেবাননে খ্রিষ্টধর্মের ব্যুৎপত্তি স্বয়ং খ্রিষ্টধর্মের মতোই প্রাচীন ও আদিম। পরবর্তীতে মুসলিম সাম্রাজ্যের অধীনে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করার পরও মাউন্ট লেবানন অঞ্চলের প্রধান ধর্ম হিসেবে খ্রিষ্টধর্মই টিকে থেকেছে। লেবাননের ভূখণ্ডে খ্রিষ্টধর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছানোর আগেই খোদ যিশুখ্রিষ্ট লেবাননের দক্ষিণের শহর টায়ারের আশপাশের অঞ্চল নিজে ভ্রমণ করেছিলেন, যা তাদের ধর্মগ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। ফলে লেবাননের এই মাটির প্রতি বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টানের এক গভীর আবেগ ও আত্মিক টান রয়েছে।

লেবাননের এই মাটিতেই ঠাঁই পেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্মেনীয় অ্যাপোস্টলিক চার্চ, মারোনাইট ক্যাথলিক চার্চ, আন্তিয়খিয়ার গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের মতো সহস্র বছরের প্রাচীন সব উপাসনালয়। আর এই রোমান ক্যাথলিক ও প্রাচীন গির্জাগুলোর প্রধান আধ্যাত্মিক অভিভাবক হলেন পোপ লিও। লেবাননে অভিযান চালানোর সময় ইসরায়েলি বাহিনী কেবল সামরিক স্থাপনাতেই আঘাত করেনি, তারা বহু প্রাচীন বিখ্যাত চার্চের ভেতরে ঢুকে মেরি বা মরিয়মের পবিত্র মূর্তির অবমাননা করেছে এবং ধর্মীয় প্রতীকের প্রতি চরম অসম্মান দেখিয়েছে। এই ঘটনাগুলো বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টানদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ইরানীরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই খ্রিষ্টান ক্ষোভকে তাদের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান অস্ত্র বা ‘ধর্মীয় কার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা হিজবুল্লাহর মাধ্যমে ইসরায়েলি সৈন্যদের চার্চ ভাঙচুর ও অবমাননার প্রচুর ছবি এবং ভিডিও সংগ্রহ করে সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকার ক্যাথলিক নান ও ধর্মযাজকদের কাছে পাঠাচ্ছে। এর ফলে এই ভয়াবহ চিত্রগুলো এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে খ্রিষ্টান সমাজকে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন প্রতি রোববারের সাপ্তাহিক প্রার্থনায় আমেরিকার বহু চার্চে নেতানিয়াহুর পাশাপাশি ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে চার্চগুলোর সুরক্ষায় আমেরিকার এই ব্যর্থতাকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অযোগ্যতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

৭০ বছর বয়সী পোপ লিও, যিনি নিজে একজন আমেরিকান (শিকাগোতে জন্ম) এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাষী ও একরোখা হিসেবে পরিচিত, তিনি ট্রাম্পের ওপর চরম অসন্তুষ্ট। মার্কিন রাজনৈতিক গোয়েন্দাদের গোপন তথ্য অনুযায়ী, এই ধর্মীয় ও আবেগগত কারণে আগামী নির্বাচনে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রিপাবলিকানদের খ্রিষ্টান ভোটব্যাংকে এক বিশাল ধস নামতে যাচ্ছে, যার নেপথ্যে পরোক্ষ ভূমিকা রাখছেন স্বোদশে জনপ্রিয় এই পোপ।

ঠিক এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পতনের আশঙ্কাই ট্রাম্পকে পাগল করে তুলেছে। তিনি বুঝতে পারছেন, ইরানীরা এবার সাধারণ কোনো যুদ্ধ খেলছে না, তারা এমন এক বৈশ্বিক স্তরে চাল দিয়েছে যেখানে তাদের পরোক্ষ পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়েছেন খোদ পোপ লিও। আর এই ফাঁদে পড়ে ট্রাম্পের এখন কিছুই করার নেই। তিউনিসিয়ার ইরানি দূতাবাস থেকে করা একটি সাম্প্রতিক পোস্ট এই পুরো পরিস্থিতির এক চমৎকার প্রতীকী রূপ। যেখানে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওর যিশুখ্রিস্টের আইকনিক মূর্তি ‘ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার’ এর সামনে আমেরিকার ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’র শোচনীয় ও নতজানু পরাজয় দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে তেহরান পুরো বিশ্বকে এবং ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিল—‘ওয়ান ফ্রন্ট ওয়ান ফাইট’। লড়াইটা এখন আর শুধু লেবাননের মাটির সীমানায় আটকে নেই, এটি এখন বিশ্বজনীন প্রতিরোধের এক নতুন ফ্রন্ট।