নিজস্ব প্রতিবেদক-
চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিত হতে যাওয়া এই টার্মিনাল দেশের বন্দর অবকাঠামো ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (৩০ আগস্ট) বেলা ১১টায় পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
অনুষ্ঠানে এপিএম টার্মিনালস বিভির গ্লোবাল হেড অব বিজনেস ইমপ্লেমেন্টেশন জেক ক্রেইগ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সংসদ সদস্য, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ডেনিশ শিপিং জায়ান্ট এপি মোলার-মায়েরস্কের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস বিভি এ প্রকল্পে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) চুক্তির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৮ লাখ টিইইউর বেশি বাড়বে। ২০ ফুট সমমানের কনটেইনারের হিসাবে এই অতিরিক্ত সক্ষমতা বন্দরের বর্তমান মোট সক্ষমতার প্রায় ২৩ শতাংশ।
কর্ণফুলী নদীর তীরে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জায়গায় নির্মাণ করা হবে টার্মিনালটি। এর মধ্যে মূল টার্মিনালের জন্য ৩২ একর, কনটেইনার ইয়ার্ডের জন্য ৭ দশমিক ১৫ একর এবং ট্রাক পার্কিংয়ের জন্য ১০ একর জমি বরাদ্দ রয়েছে।
এপিএম টার্মিনালস ‘ডিজাইন, বিল্ড, ফিন্যান্স, অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার’ (ডিবিএফওটি) মডেলে টার্মিনালটি নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। নির্মাণকাজ শেষ করতে সময় লাগবে প্রায় তিন বছর। চুক্তি অনুযায়ী, ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনার সুযোগ পাবে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে আরও ১৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সেখানে সরাসরি ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানো যাবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে যে ধরনের জাহাজ ভেড়ে, তার তুলনায় এসব জাহাজের ধারণক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ।
লালদিয়া টার্মিনালে থাকবে ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটি, সাতটি শিপ-টু-শোর ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর।
বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে টার্মিনালটি তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বন্দর পরিচালনায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুবিধায় জাহাজের অপেক্ষার সময় এবং পণ্য খালাসের সময় কমে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রকল্পের প্রথম তিন বছরে নির্মাণকাজ, সরঞ্জাম স্থাপন ও আনুষঙ্গিক কাজে ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ শুরুতেই ২৫ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম পাবে।
এ ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার কনসেশন ফি পাবে। প্রতিটি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য পাওয়া যাবে ২১ ডলার। বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৯ লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে গেলে প্রতি কনটেইনারের ফি বেড়ে ২৩ ডলার হবে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল প্রকল্পটি বেশ কয়েক বছর ধরে প্রক্রিয়াধীন ছিল। ২০২১ সালের জুনে পিপিপি কাঠামোর আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা সহজ করতে বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএম টার্মিনালস বিভির মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
লালদিয়া টার্মিনালে এপিএম টার্মিনালসের বিনিয়োগকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এ বিনিয়োগের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
২৯ আগস্ট এপিএম টার্মিনালসের চেয়ারম্যান রবার্ট মায়েরস্ক উগলার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি বলেন, ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ বাংলাদেশে আরও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটরের বাংলাদেশে উপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়াবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আমিরুল হক এপিএম টার্মিনালস ও এপি মোলার-মায়েরস্ককে চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল, জাহাজ নির্মাণ এবং বড় শিল্প উদ্যোগে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কোম্পানিগুলোকে অবদান রাখার আহ্বান জানান তিনি। লালদিয়া টার্মিনাল দ্রুত বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।