নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, আপিল বিভাগের প্রচলিত কার্যতালিকা অনুযায়ী শুনানি হলে ২০৩১ সালের আগে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্ভব নয়।
আইনজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকার পর দণ্ডিত আসামিদের করা আপিল বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। সাধারণত সাল অনুযায়ী এসব আপিলের শুনানি হয়ে থাকে। বর্তমানে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের আপিল শুনানি চলছে। ফলে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আপিল বিভাগ।
যেভাবে হত্যা করা হয় আবরারকে
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে একটি কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পরদিন চকবাজার থানায় ১৯ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাঁর বাবা বরকত উল্লাহ। পরে তদন্ত শেষে ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
বিচারিক আদালতে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন দণ্ডিত আসামিরা। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে।
২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করে বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রাখেন। বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় দেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কেবল ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এমন অভিযোগ কোনোভাবেই কাউকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যার বৈধতা দিতে পারে না।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালেই আপিল করেন কারাবন্দি দণ্ডিত আসামিরা। তাঁদের সবাই বুয়েটের শিক্ষার্থী।
হাইকোর্টের রায় নিয়ে আসামিপক্ষের আপত্তি
হাইকোর্টের রায়ের সমালোচনা করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, তাঁর মতে, রায়টি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। আসামিদের খালাসের পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিতর্ক যথাযথভাবে খণ্ডন না করেই হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আজিজুর রহমান দুলু বলেন, আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল সাধারণত সাল অনুযায়ী শুনানি হয়। সে হিসাবে ২০৩১ সালের আগে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি চায় রাষ্ট্রপক্ষ
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আপিলগুলো একসঙ্গে শুনানি হবে বলে রাষ্ট্রপক্ষ প্রত্যাশা করছে। শুনানির প্রাথমিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে দণ্ডিত আসামিদের আইনজীবীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাষ্ট্রপক্ষের তৎপরতাও অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে রাষ্ট্রপক্ষ।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, এ মামলার রায়ের কার্যকারিতা দেখতে চায় রাষ্ট্রপক্ষ। মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কবে হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির সিদ্ধান্ত আপিল বিভাগ নিলে নিষ্পত্তির সময়সীমা নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।