• ঢাকা |

রায় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে বিচারপ্রার্থীর অভিযোগ


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামে একটি সাততলা আবাসিক ভবন নির্মাণের চুক্তি বাতিল করে দেওয়া দেওয়ানি আদালতের রায় ও ডিক্রি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের এক পরিচালক। তার অভিযোগ, প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ভবন নির্মাণের পরও আদালত ওই বিনিয়োগের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা না করে চুক্তি ও আমমোক্তারনামা অকার্যকর ঘোষণা করেছেন। এতে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও ফ্ল্যাট ক্রেতারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

‘সিটি স্ক্যাপ প্লেনার্স লিমিটেড’-এর পরিচালক মাহাম্মাদ নাজমুচ ছাকের সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে এ বিষয়ে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে চট্টগ্রামের সিনিয়র সিভিল জজ, ২য় আদালতের (ভারপ্রাপ্ত ৭ম সিনিয়র সিভিল জজ) ফারহান সামিনের গত ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া রায় ও ডিক্রি নিয়ে অভিযোগ তুলে বিষয়টি পর্যালোচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের হালিশহর হাউজিং এস্টেটের নিউ এ ব্লকের এইচ অ্যান্ড এস লেইন নম্বর-৪-এর বাড়ি নম্বর-১-এর ৩ দশমিক ৭৫ কাঠা জমিতে সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণের জন্য ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর জমির মালিক ক্বারী আবুল কাশেমের সঙ্গে ‘সিটি স্ক্যাপ প্লেনার্স লিমিটেড’-এর ডেভেলপমেন্ট চুক্তি হয়। একই দিনে ৫১৮০ নম্বর অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তারনামার মাধ্যমে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে আমমোক্তার নিয়োগ করা হয়।

চুক্তি অনুযায়ী জমির দখল বুঝিয়ে দেওয়ার পর ৪২ মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা ছিল। আবেদনে দাবি করা হয়, ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি জমির মালিক জায়গাটি খালি করে দেওয়ার পর মাটি পরীক্ষা ও নকশা অনুমোদনের কাজে আট মাসের বেশি সময় চলে যায়। ২০১১ সালের শেষ দিকে নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১৫ সালের জুনের মধ্যে ভবনের সাতটি ছাদ, অভ্যন্তরীণ দেয়াল, জানালা ও বারান্দার গ্রিল, দরজার চৌকাঠ এবং ভবনের ভেতর-বাইরের আস্তরের কাজ শেষ হয়। তখন টাইলস, দরজা ও থাই গ্লাসের কাজ চলছিল।

এর মধ্যেই জমির মালিক ক্বারী আবুল কাশেম ডেভেলপমেন্ট চুক্তি বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণার দাবিতে মামলা করেন। একই সঙ্গে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রি না করার জন্যও আদালতের কাছে আবেদন করেন।

আবেদনে আরও বলা হয়, ভবন নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে জমির মালিকের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি বা অভিযোগ ছিল না। পরে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য ফ্ল্যাটগুলো জমির মালিকের আত্মীয়সহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়। ভবন নির্মাণে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বড় একটি অংশ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ এবং ব্যাংকঋণ থেকে ব্যয় করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ডেভেলপারের দাবি, আমমোক্তারনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, এতে ডেভেলপারের আর্থিক বিনিয়োগ থাকায় আপস নিষ্পত্তি ছাড়া আমমোক্তারনামাটি বাতিল বা প্রত্যাহার করা যাবে না। এমনকি আমমোক্তারনামা দাতার মৃত্যুর পরও এটি বলবৎ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে গত ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, চুক্তি অনুযায়ী ৪২ মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৪ অক্টোবরের মধ্যে ভবন নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল। ওই সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ৫১৭৯ নম্বর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে বলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন। একই সঙ্গে চুক্তিটি বাতিল ও অকার্যকর এবং বাদীর ওপর বাধ্যকর নয় বলে ঘোষণা করা হয়।

আবেদনে বলা হয়, আদালত ৫১৭৯ নম্বর চুক্তি ও ৫১৮০ নম্বর আমমোক্তারনামার ভিত্তিতে নালিশি সম্পত্তিতে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাজ করার অধিকার নেই বলে ঘোষণা করেন। আমমোক্তারনামাটিকেও অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে ১৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঘরভাড়া বাবদ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তার আবেদনে মামলার ধার্য তারিখ এগিয়ে আনার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তার দাবি, মামলাটি প্রথমে ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে সিনিয়র সিভিল জজ, ৩য় আদালতে ধার্য ছিল। পরে মামলাটি ৭ম আদালতে বদলি হলে ১৯ নভেম্বর যুক্তিতর্কের জন্য দিন ধার্য করা হয়। এরপর বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ধার্য তারিখ এগিয়ে ১৮ আগস্ট করা হয়। পরবর্তীতে ১৮, ২০ ও ২৪ আগস্ট বিভিন্ন তারিখে কার্যক্রম এগোয়।

এতে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের সন্দেহ হয়, ভারপ্রাপ্ত ৭ম সিনিয়র সিভিল জজ ফারহান সামিন বাদীপক্ষের প্রভাবাধীন হয়ে কোম্পানির প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিনিয়োগের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা না করে একপেশে রায় দিয়েছেন। আবেদনে এ অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

[সিটি স্ক্যাপ প্লেনার্স লিমিটেড’-এর পরিচালক মাহাম্মাদ নাজমুচ ছাকের বলেন, আমাদের প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ছাদ, দেওয়াল, গ্রিল, থাই গ্লাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফ্লোরে টাইলস লাগানোর কাজও শেষের পথে। অথচ দেশের অসহযোগ আন্দোলনের কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলেও, জমির মালিক আবুল কাশেম কোনো সহযোগিতা না করে অন্যায়ভাবে বাসা ভাড়া দাবি করছেন এবং আমাদের সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগকে আত্মসাত করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা ও হয়রানি চালাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, সাড়ে তিন কোটি টাকা খরচ করে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ করার পর যদি একজন ভূমিমালিক অসৎ উদ্দেশ্যে মামলা করে ডেভেলপার ও ফ্ল্যাট ক্রেতাদের হয়রানি করেন, তবে পুরো আবাসন খাত হুমকির মুখে পড়বে। আমরা কোতোয়ালি থানায় জিডি ও তদন্ত করিয়ে সব সত্যতা তুলে ধরেছি। আদালতের কাছে আমাদের বিনীত আবেদন, কোনো পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যেন এই মামলার সঠিক ও ন্যায়সংগত তদন্ত বা বিচার করা হয়।

এবিষয়ে বিবাদীপক্ষের আইনজীবি অ্যাডভোকেট সেকান্দর বলেন ‘সিটিসকেপ প্ল্যানার্স লিমিটেডের সাথে ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ৪২ মাসের মধ্যে ৭ তলা ভবনটি সম্পূর্ণ করার কথা ছিল। ২০১৫ সালের এপ্রিলের মধ্যেই ভবনের মূল কাঠামো, প্লাস্টার, রঙ এবং প্রায় ৯৯ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল; কেবল সামান্য কিছু টাইলস, থাই গ্লাস ও কিছু দরজার কাজ বাকি ছিল। কিন্তু সামান্য এই কাজ বাকি থাকতেই প্রতিপক্ষ কোনো সালিশি ট্রাইব্যুনাল বা নিয়মের তোয়াক্কা না করে এবং প্রায় সাড়ে ত্রিশ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক বিনিয়োগকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে চুক্তি ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের মামলা করেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এটি বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। নিম্ন আদালতের এই রায় আইনসম্মত বা ন্যায়সংগত হয়নি, তাই আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করছি। মানুষের অধিকার রক্ষায় আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।