• ঢাকা |

আর্থিক বোঝাপড়ায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে আগুন: ৫ বাড়ির মালিক পেল ১৩ লাখ টাকা


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:


বিশেষ প্রতিবেদক

# শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আগুন
#উদ্দেশ্য দেশের পাশাপাশি ভারতে যাতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে
#আগুনের আগে খাগড়াছড়ি মানিকছড়িতে আওয়ামী লীগের নেতার বাড়িতে গোপন বৈঠক

চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বসতঘরে লাগা রহস্যজনক আগুনের ঘটনাগুলো স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও প্রশ্ন তৈরি করেছিল। কে, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে এসব অগ্নিসংযোগ—তা নিয়ে ছিল নানা গুঞ্জন। অবশেষে গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তি, জবানবন্দি, পুলিশের তদন্ত এবং উদ্ধারকৃত আলামতের সূত্র ধরে খুলে যেতে শুরু করেছে সেই জট। আসামিদের জবানবন্দিতে ওঠে এসেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়া হয়। আগুন দেওয়ার আগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে পাঁচ বাড়ির মালিককে ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হারুনের আদালত মনির হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এতে আসামি মনির হোসেন উল্লেখ করেন, তার মায়ের হত্যার বিচার চেয়ে তিনি প্রথমে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার কাছে যান। ওই নেতা তাকে আশ্বাস দেন যে বিচার পাইয়ে দেওয়া হবে। তবে এর জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে বলে জানানো হয়।

মনিরের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে ওই নেতা তাকে রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পাশাপাশি কয়েকজন পেশাদার অপরাধীর সঙ্গেও তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, যারা মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

জবানবন্দিতে মনির বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরাতে হলে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন দিতে হবে—এমন নির্দেশনা তাকে দেওয়া হয়। এ কাজের বিনিময়ে তাকে এক লক্ষ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি রাঙামাটি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিনি নিজেকে অশিক্ষিত উল্লেখ করলে আওয়ামী লীগ নেতা তাকে বলেন, হাসিনা ফিরে এলে শিক্ষিত হওয়া লাগবে না।

মনির আরও জানান, রাউজানে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কয়েকদিন আগে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ওই আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে একটি গোপন বৈঠক হয়। বৈঠকে হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এতে আগুন দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ঘরগুলোর মালিকপক্ষের পাঁচজনও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনা শুধু রাউজানে নয়, সারাদেশে ঘটানো হবে। উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে রাস্তায় নামানো এবং বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করা। মনিরের জবানবন্দি অনুযায়ী, পরিকল্পনাকারীরা আশা করেছিলেন, এসব ঘটনার প্রতিবাদ ভারতেও ছড়িয়ে পড়বে। এতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হবে এবং দুই দিনের মধ্যে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

অগ্নিসংযোগের কৌশল সম্পর্কে মনির বলেন, যেসব বাড়িতে আগুন দেওয়া হবে, সেসব বাড়ির লোকজনকে আগেই সতর্ক করা হতো, যাতে তারা ঘর থেকে বের হয়ে যেতে পারে এবং পোষা প্রাণী সরিয়ে নিতে পারে। বাড়ির বাইরে পুরনো কাপড় ও লুঙ্গি রেখে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনার ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাঙামাটির এক আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলরের মাধ্যমে বাড়ির মালিকদের মধ্যে অগ্রিম প্রায় ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।

পুলিশ জানায়, গত ডিসেম্বর মাসে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় গভীর রাতে মোট পাঁচটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৮ ডিসেম্বর রাউজান সদর ইউনিয়নের কেউটিয়া বড়ুয়াপাড়া গ্রামে। সেখানে সাধন বড়ুয়ার বসতঘর ও গোয়ালঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন ১৯ ডিসেম্বর রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঢেউয়াপাড়া গ্রামে একই কায়দায় দুটি হিন্দু বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে ২৩ ডিসেম্বর ভোররাতে রাউজান পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম সুলতানপুর গ্রামে সুখ শীল ও অনিল শীলের মালিকানাধীন দুই পরিবারের দুটি বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়।

এতে কয়েকটি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কিছু ঘর সম্পূর্ণ ভস্মিভূত হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি কয়েকটি ব্যানার উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যানারগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর লেখা ছিল।

পুলিশ জানায়, প্রতিটি ঘটনায় মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ হতাহত হননি। আগুন লাগা প্রতিটি বাড়ির পাশেই পুকুর ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানায় তিনটি মামলা করা হয়। প্রতিটি ঘটনার পরপরই পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন।

তবে টাকার বিনিময়ে নিজের বাড়িতে আগুন লাগানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঢেউয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বিমল তালুকদার। তিনি বলেন, গভীর রাতে পরিবারের চার সদস্য ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ ঘরে আগুন জ্বলে ওঠে। বাইরে দরজা বন্ধ থাকায় তারা বেড়া কেটে বের হন। তারা দিনমজুর মানুষ, কেন আগুন দেওয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না।

মনিরের স্বীকারোক্তির বিষয়টি জানানো হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারেননি এবং টাকা নেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন।

এদিকে, এ ঘটনায় মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ। তিনি বলেন, রাতের আঁধারে পরিকল্পিতভাবে ব্যানার টানিয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। এসব ঘটনার মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা করা হয়। গত ২ জানুয়ারি রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কলেজগেট এলাকা থেকে মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওইসময় তার বসতঘর তল্লাশি করে তিনটি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়, যা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা ব্যানারের সঙ্গে মিল রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ১৫–১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত ছিল। পাশাপাশি জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়াতে ষড়যন্ত্রমূলক ব্যানার টানানো হয়। ব্যক্তিগত পারিবারিক বিরোধ ও প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে ব্যানারে কিছু ব্যক্তির নাম ও মোবাইল নম্বর যুক্ত করা হয়। মনিরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে বাকি ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন- মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ।

তাদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, দুটি কেরোসিন তেলের কনটেইনার, একটি কেরোসিন তেলের বোতল, কেরোসিন তেলমাখা একটি লুঙ্গি ও একটি পুরনো কালো শার্ট উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যানারে উল্লেখিত মোবাইল নম্বর সংরক্ষিত একটি মোবাইল ফোন, একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে, যা বিভিন্ন ঘটনাস্থলে যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়েছিল।

 

 

​​​​