• ঢাকা |

চট্টগ্রাম বন্দরে ৮ চালানে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা, ঘোষণার বাইরে মিলল নিষিদ্ধ ক্রিমসহ বিভিন্ন পণ্য


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:


নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা আটটি চালানে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসংগতি এবং শুল্ক ফাঁকির চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। টুথপিক, পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, হিট ট্রান্সফার পেপার ও স্টেইনলেস স্টিল আমদানির ঘোষণা দিয়ে এসব চালানে উচ্চ শুল্কের প্রসাধনী, নিষিদ্ধ ক্রিম, গাড়ির যন্ত্রাংশ, নাট-বল্টু, বেয়ারিংসহ বিভিন্ন পণ্য আনা হয়েছে। এসব চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের যৌথ তৎপরতায় এসব অসংগতি উদ্ঘাটিত হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) এনবিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, চীন, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা বিভিন্ন চালান পরীক্ষা করে ঘোষণার বাইরে পণ্য পাওয়া গেছে। কোনো চালানে ঘোষিত পণ্যের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন পণ্য ছিল, আবার কোনো চালানে ঘোষিত পণ্যের পাশাপাশি অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়।
পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিনের বদলে প্রসাধনী
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ঢাকার নিউমার্কেটের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আমদানির ঘোষণা দেয়। তবে কাস্টমসের পরীক্ষায় মেশিনের পরিবর্তে স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, এলইডি লাইট, সানগ্লাস ও কালো চুলের শ্যাম্পু পাওয়া যায়। এ ছাড়া ঘোষিত ওজনের চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি বেশি পণ্য ছিল চালানটিতে। এতে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় আড়াই কোটি টাকা।
টুথপিকের চালানে পাকিস্তানি ক্রিম
পুরান ঢাকার চকবাজারের কাফ কর্পোরেশন চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-১০৯৮৭৬৬-এর চালানটি পরীক্ষা করে মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি টুথপিক পাওয়া যায়। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল পাকিস্তানে তৈরি গোরি বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, সানগ্লাস ও ডিলে স্প্রে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে কয়েক ধরনের ক্রিমকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) কর্তৃক নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
গাড়ির যন্ত্রাংশেও পণ্যের অসংগতি
ঢাকার এইচ আর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে ১৬ হাজার ৪০ কেজি ইঞ্জিন রাবার বুশ আমদানির ঘোষণা দিলেও পরীক্ষায় প্রকৃত রাবার বুশ পাওয়া যায় ৬ হাজার ৬২৫ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বেয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। এ চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৪৪ লাখ টাকা।
একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি চালানে কাস্টমসের নজরদারির মধ্যে কমিশনারের পূর্বানুমতি ছাড়া এইচএস কোড পরিবর্তনের আবেদন করার চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
হিট ট্রান্সফার পেপারের বদলে পিভিসি ব্যানার
চীন থেকে ২৩ হাজার ৬১৮ কেজি হিট ট্রান্সফার পেপার আমদানির ঘোষণা দেয় নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স। কিন্তু বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-১০৫৪০০১-এর চালানটি পরীক্ষা করে মাত্র ৩ হাজার ১৬০ কেজি হিট ট্রান্সফার পেপার পাওয়া যায়। বাকি প্রায় ২১ হাজার ৪৬৭ কেজি পণ্যের মধ্যে ছিল ঘোষণাবহির্ভূত পিভিসি ফ্লেক্স ব্যানার। এ চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
স্টেইনলেস স্টিলের ঘোষণায় নাট-বল্টু
বংশালের নিউ রনি এন্টারপ্রাইজ ও ওয়ারীর মোহাম্মাদীয়া ট্রেডের চালানেও ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসংগতি পাওয়া গেছে।
মোহাম্মাদীয়া ট্রেড ২২ টন স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল ও এক্সকেভেটর গিয়ার আমদানির ঘোষণা দেয়। তবে চালানে ঘোষিত পণ্যের মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৮ টন পাওয়া যায়। বিপরীতে ২২ হাজার ১১৩ কেজি নাট, বল্টু ও স্ক্রু পাওয়া যায়। এ চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৩২ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের একটি চালানে ১৭ হাজার ৫৯২ কেজি নাট-বল্টু, ২ হাজার ৭৮৭ কেজি ভারী রোলিং বেয়ারিং এবং ২ হাজার ৩৩৬ কেজি রিভলভিং চেয়ারের গ্যাস লিফট সিলিন্ডার পাওয়া যায়। এ চালানে সম্ভাব্য রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৪২ লাখ টাকা।
কাস্টমসের নিয়ন্ত্রণাধীন কনটেইনার সরানোর চেষ্টা
কাফ কর্পোরেশনের আরেকটি চালান ঘিরে কাস্টমসের নজরদারি এড়িয়ে কনটেইনার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
এনবিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চালানটি ইয়েলো লেনভুক্ত ছিল। শুল্ক ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পর সিআইসি ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের এআইআর শাখা অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থায় কনটেইনারটি লক করে। কিন্তু কায়িক পরীক্ষার নির্ধারিত তারিখের আগেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর কনটেইনারটি অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় বিল অব লেডিংয়ে উল্লেখ করা প্রকৃত সিল ভেঙে অন্য সিল লাগানো হয়েছিল বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এনবিআর জানিয়েছে, ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসংগতি, শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা এবং কাস্টমসের নিয়ন্ত্রণাধীন কনটেইনার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসংগতি ও শুল্ক ফাঁকির চেষ্টার বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।