নিজস্ব প্রতিবেদক-
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে অসামান্য অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মর্যাদাপূর্ণ ‘ডা. লি জং-উক মেমোরিয়াল প্রাইজ ফর পাবলিক হেলথ’ অর্জন করেছেন দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আবুল ফায়েজ।
গত ২০ মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচও’র ৭৯তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার প্রদান করেন ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধি সম্মেলনের সভাপতি ভিক্টর এলিয়াস আতাল্লাহ লাজাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা।
প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এ সম্মান অর্জনের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে উজ্জ্বল হয়েছে লাল-সবুজের পতাকা। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নীরবে জনস্বাস্থ্য, গবেষণা এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাওয়া অধ্যাপক ডা. এম এ ফায়েজের জন্য এ অর্জন শুধু ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়, বরং বাংলাদেশের চিকিৎসা ও গবেষণা খাতেরও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
অধ্যাপক ডা. এম এ ফায়েজ বিশেষভাবে পরিচিত নেগলেকটেড ট্রপিক্যাল ডিজিজ (এনটিডি), সর্পদংশন, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, যক্ষ্মা ও নিপাহ ভাইরাস নিয়ে গবেষণার জন্য। বাংলাদেশে সাপের কামড়কে দীর্ঘদিন অবহেলিত স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও তিনি এ বিষয়ে গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতা তৈরিতে পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করেন।
শুধু চিকিৎসা নয়, বিষহীন সাপ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়েও মানুষকে সচেতন করে তুলেছেন তিনি। দেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার অন্তত দুই বছর আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশে ‘এভিডেন্স বেইজড মেডিসিন’ বা প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির চর্চা জনপ্রিয় করতে ১৯৯৯ সাল থেকে নিরলসভাবে কাজ করছেন অধ্যাপক ফায়েজ। তাঁর উদ্যোগেই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে গবেষণানির্ভর চিকিৎসা ব্যবস্থার চর্চা শুরু হয়।
এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ‘ওয়ার্ল্ড এভিডেন্স-বেইজড হেলথকেয়ার ডে’ কর্তৃক ‘এভিডেন্স অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর এফসিপিএস (মেডিসিন) ডিগ্রি অর্জন করেন অধ্যাপক ফায়েজ। পরে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নিউক্যাসল থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে ইন-সার্ভিস ট্রেইনি চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ–এর অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ২০০৮-২০০৯ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
ম্যালেরিয়া গবেষণায় তাঁর অবদান আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। তাঁর লেখা একটি গবেষণা নিবন্ধ ২০১৪ সালে ‘ম্যালেরিয়া নেক্সাস’-এর বিশ্বসেরা ১০ গবেষণাপত্রের তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে।
এছাড়া তাঁর নেতৃত্বাধীন ম্যালেরিয়া রিসার্চ গ্রুপের একটি গবেষণা ২০১০ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী British Medical Journal–এর সেরা বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এবারের ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে মালির বানকোনি কমিউনিটি হেলথ অ্যাসোসিয়েশন কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ‘সাসাকাওয়া স্বাস্থ্য পুরস্কার’ অর্জন করে। থাইল্যান্ডের ওয়ারাওইত টন্টিওয়াত্তানাসাপ গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় অবদানের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন পুরস্কার লাভ করেন।
এছাড়া নেলসন ম্যান্ডেলা স্বাস্থ্য উন্নয়ন পুরস্কার পেয়েছেন মিশরের আমর মোহাম্মদ কানদিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী বোর্ড গত ফেব্রুয়ারিতে বিজয়ীদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে। ডব্লিউএইচও’র সাবেক মহাপরিচালক লি জং-উক–এর মৃত্যুর ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের পুরস্কারগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।