• ঢাকা |

২০ বছর পর সংসদে বিএনপির ৯.৩৮ লাখ কোটির বাজেট,সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

নিজস্ব প্রতিবেদক-

দীর্ঘ দুই দশক পর আবারও জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট।

প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

অর্থ আসবে যেসব খাত থেকে

সরকারের রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে থাকছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্ক থেকেই এই অর্থের বড় অংশ আসবে।

এছাড়া এনবিআরবহির্ভূত কর রাজস্ব থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারি সেবা, ফি, লভ্যাংশ ও অন্যান্য উৎস থেকে করবহির্ভূত রাজস্ব হিসেবে আরও ৪০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজস্ব আয়ে পুরো ব্যয় মেটানো সম্ভব না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পরিচালন ব্যয়ে

প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও সংশ্লিষ্ট খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয়ে ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও কর্মসংস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ এ অর্থ থেকে বাস্তবায়ন করা হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

অবকাঠামো ও কৃষি খাতে বড় বরাদ্দ

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। সড়ক, সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।

কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষি ভর্তুকি, কৃষক সহায়তা ও খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে।

স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা এবং পানিসম্পদ খাতে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা

অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয় খাত।

প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও জলবায়ু খাতে নতুন উদ্যোগ

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দিতে স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা, ৫-জি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি ও স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণে ২০০ কোটি টাকা, সৃজনশীল অর্থনীতি, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ১০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

ধর্মীয় খাতে ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা ও ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার জন্য বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ৮১ কোটি টাকা।

দুই দশক পর বাজেট নিয়ে সংসদে বিএনপি

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের পক্ষে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন। প্রায় ২০ বছর পর সেই বাজেটের প্রায় ১৩ গুণ বড় বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে হাজির হয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।