কনকনে শীতের রাত। চট্টগ্রামের আনোয়ারার একটি সড়কের পাশে নিঃশব্দে বসে আছে দুই ছোট্ট শিশু — চার বছরের আয়েশা আক্তার আর ১৪ মাস বয়সী মোরশেদ। হাতে-চোখে ভয়, মুখে কষ্টের ছাপ। পৃথিবী যেন তাদের জন্য থেমে গেছে। গত রোববার রাতে সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন এক দয়ালু সিএনজি চালক। তিনি শিশুগুলোর কাঁপতে থাকা হাত ধরে তাদেরকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান, যেখানে তারা প্রথমবার অনুভব করে নিরাপত্তা। এরপর আনোয়ারা থানা পুলিশ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু দুটির চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ছোট মোরশেদের জন্মগত রোগ আছে, বড় আয়েশার চর্মে সমস্যা রয়েছে।
শিশু দুটির দুঃখ কেবল শারীরিক নয়, মানসিকও। তাদের বাবা-মায়ের আলাদা হওয়া, দিনের পর দিন নিখোঁজ থাকা—সব মিলিয়ে তাদের শৈশবের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। শিশুদের বাবা খোরশেদ আলম জানান, প্রায় ছয় মাস আগে তার স্ত্রী তাদের সন্তানদের নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যান। নিজের ছোট প্রতিবন্ধী সন্তানকে ভিক্ষাবৃত্তিতে পাঠানো হয়েছিল।
“আমি অনেকবার খুঁজেছি, জরিমানা দিয়েছি, কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি,”—মৃদু কণ্ঠে বলেন বাবা। এই ছোট্ট দুজনের চোখে বাবা-মায়ের ছায়া হারানো নিঃশব্দ বেদনার ছবি ফুটে উঠছে। সামাজিক সংহতি ও মানবিক সহানুভূতির আশ্রয়ে তারা এখন নিরাপদ। জেলা প্রশাসক ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে শিশুগুলোর জীবন। তবে তাদের ভবিষ্যৎ ও মানসিক শান্তি এখনো ঝুঁকির মধ্যে।
এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে ভঙ্গুর অংশ। তাদের নিরাপত্তা ও স্নেহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, আমাদের প্রত্যেকের সহানুভূতি, ভালোবাসা আর দয়া এই ছোট্ট প্রাণগুলোকে জীবনের আলো দেখাতে পারে। আয়েশা আর মোরশেদের কাঁপতে থাকা হাত, ভীত চোখ আর নিঃশব্দ কান্না আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে—একটি মানবিক সমাজ মানে কেবল প্রশাসনের নয়, আমাদের সবার দায়িত্ব।