• ঢাকা |

অনলাইন আম ব্যবসায়ীদের লাভের বড় অংশ গিলে খাচ্ছে ফেসবুক বিজ্ঞাপন


নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন, ২০২৬ ইং
ছবির ক্যাপশন:

চাঁপাইনবাবগঞ্জে দিন দিন বাড়ছে অনলাইনে আম বিক্রির পরিমাণ। বর্তমানে জেলার ৩০ শতাংশের বেশি আম বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে। তবে এই বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ব্যয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিতে বাধ্য হওয়ায় লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিজ্ঞাপন খাতে।

উদ্যোক্তারা জানান, অনলাইনে ক্রেতা আকৃষ্ট করতে আমবাগানে ভিডিও ও ছবি ধারণ করে প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। এরপর সেগুলো ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রচার করা হয়। এসব বিজ্ঞাপনের বিল ডলারে পরিশোধ করতে হয়। ফলে বিজ্ঞাপন, প্যাকেজিং, পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয় মিলিয়ে ব্যবসার মোট খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

কানসাটের অনলাইন আম ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, অনলাইনে ব্যবসা করতে হলে এখন বিজ্ঞাপনের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বিজ্ঞাপনের খরচ এতটাই বেড়েছে যে প্রতি কেজি আমে গড়ে প্রায় ৩০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হচ্ছে। এতে প্রত্যাশিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

রানিহাটির ব্যবসায়ী শাহীন আলী বলেন, ফেসবুকে বিজ্ঞাপন না দিলে অর্ডারই আসে না। প্রতিদিন বিজ্ঞাপনের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু বিক্রি বাড়লেও লাভের বড় অংশ বিজ্ঞাপন ব্যয়ে চলে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অনলাইন উদ্যোক্তা আতিকুর রহমান স্বজন জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লোকসানের পর তিনি অনলাইন আম বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় ৫০ ডলারের ফেসবুক বিজ্ঞাপন চালাতে হতো। পাশাপাশি শ্রমিক, প্যাকেজিং ও অন্যান্য খাতে আরও প্রায় দুই হাজার টাকা ব্যয় হতো। অথচ বিক্রি থেকে দৈনিক আয় ছিল গড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো। ফলে প্রতিদিনই কয়েক হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেকেই মনে করেন অনলাইনে বেশি দামে আম বিক্রি করে ব্যবসায়ীরা বেশি লাভ করেন। বাস্তবে বিজ্ঞাপন, প্যাকেজিং, পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয় পরিশোধের পর লাভের সুযোগ খুবই সীমিত থাকে।

ঢাকা থেকে কানসাট আমবাজারে আসা ক্রেতা নয়ন আলী বলেন, অনলাইনে যে দামে আম বিক্রি হতে দেখেছেন, স্থানীয় বাজারে তার চেয়ে অনেক কম দামে একই আম পাওয়া যাচ্ছে। তবে এই মূল্য পার্থক্যের সুবিধা চাষিরা পাচ্ছেন না। তার মতে, চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ভোক্তার কাছে আম পৌঁছানোর ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও কম দামে আম কিনতে পারবেন।

শিবগঞ্জ উপজেলা ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবিব বলেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ২০০ জন অনলাইন আম ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাদের অনেকেই প্রতিদিন ১০০ ডলার বা তারও বেশি অর্থ ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ব্যয় করেন। জেলার সব উদ্যোক্তার সম্মিলিত বিজ্ঞাপন ব্যয়ের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছায়, যার বড় অংশ বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল বিপণনের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি, চাষি ও ক্রেতার সরাসরি সংযোগ বৃদ্ধি এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে ছোট উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা আরও কঠিন হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক বলেন, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চাষিদের সঙ্গে সুপারশপ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা ন্যায্যমূল্য পান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, রপ্তানিযোগ্য মানের আম উৎপাদন বাড়ানো গেলে কৃষক সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে, কৃষক লাভবান হবেন এবং দেশের আম শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।