পটিয়া উপজেলা প্রতিনিধি :
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পাহাড়ি অঞ্চলে তৈরি চোলাই মদ ও অন্যান্য মাদক ছড়িয়ে পড়ছে পটিয়া, চন্দনাইশ ও বোয়ালখালী উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায়। পটিয়া–রাঙ্গুনিয়া সীমান্তবর্তী সরফভাটা এলাকা এবং আশপাশের গহীন পাহাড়ে এসব মাদক উৎপাদন হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্র মতে, পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে মাদক কারবারিদের যোগসাজশে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার চোলাই মদ তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের সহযোগিতায় পটিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অপহরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
অপহরণ ও মুক্তিপণের ভয়াবহ চিত্র
মাদক কারবারিদের সহযোগিতা ও ইন্ধনে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী স্থানীয় কৃষক, রাখাল ও বাগান মালিকদের অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে অপহৃতদের মুক্তি দেওয়া হয়। গত এক বছরে পটিয়ার পাহাড়ি এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি অপহরণের শিকার হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই মুক্তিপণের মাধ্যমে মুক্তি পেলেও, ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পটিয়ার পূর্ব হাইদগাঁও এলাকা থেকে অপহৃত হন চন্দনাইশ উপজেলার পশ্চিম এলাহাবাদ গ্রামের বাসিন্দা মিনি ট্রাকচালক মোসলেম উদ্দিন। অপহরণের পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আর ফিরে আসেননি।
পাহাড় থেকে সমতলে মাদকের রুট
পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও, কেলিশহর, কচুয়াই ও খরনা ইউনিয়নে পাহাড়ঘেঁষা বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে মাদক সমতলের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সূত্র মতে, হাইদগাঁও ইউনিয়নের পাহাড়ঘেঁষা সাতগাউছিয়া দরবার সংলগ্ন বিওসি রোড ও এটিআর এগ্রো খামারসংলগ্ন সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার লিটার চোলাই মদ পাচার হচ্ছে। পান বাজার ও হরিসাধন দেবব্রহ্মণের বাড়ি ঘাটাসংলগ্ন সড়ক ব্যবহার করে হাইদগাঁও গুচ্ছগ্রাম এলাকায় গভীর রাতে গাড়ি প্রবেশ করিয়ে ভোররাতে বের করা হয় মাদক। এসব মাদক পটিয়া ও পার্শ্ববর্তী বোয়ালখালী উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।
কচুয়াই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আনার বাপের বাড়ি সংলগ্ন পাহাড়ি রুট হয়ে কচুয়াই ও খরনা ইউনিয়নে প্রবেশ করছে চোলাই মদের আরেকটি বড় চালান। খরনা খাল হয়ে চন্দনাইশের রৌশন হাট ব্রিজ দিয়ে এসব চোলাই মদ চন্দনাইশ উপজেলায়ও প্রবেশ করছে।
মাদকের হাইদগাঁও ও কেলিশহর সিন্ডিকেট
প্রতিটি এলাকায় রয়েছে মাদকের নিজস্ব ডিলার ও সিন্ডিকেট, যারা তাদের নির্ধারিত অঞ্চলে মাদক সরবরাহ করে। সূত্র মতে, হাইদগাঁও এলাকার একরাম পটিয়ার মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা। একই ইউনিয়নের মরাখাল এলাকার কালু, কাজীপাড়ার নাজিম, আকবর শাহ মাজার এলাকার কুতুবউদ্দিন, মহিউদ্দিন ও জুয়েল তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলে জানা গেছে। একাধিক অবৈধ ওয়াকিটকি একরামের কাছে রয়েছে, যার মাধ্যমে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়।
অন্যদিকে, কেলিশহর ইউনিয়নে মাদক কারবারিদের মূল আস্তানা হিসেবে পরিচিত গুচ্ছগ্রাম এলাকা। এই অঞ্চলের মাদক নিয়ন্ত্রণ করেন ইলিয়াস মেম্বার ও তার সহোদর ইসমাইল। খিল্লাপাড়া ও ভট্টাচার্য হাট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন কালু। রতনপুর ও মৌলভীবাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ নেতা সুমন। ছত্তর পেটুয়া এলাকায় নুর নবী ও কালাম এবং রমেশ বাবুরহাট (দারগাহাট) এলাকায় লিটন জলদাস মাদক নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানা গেছে। তাদের প্রায় সবাই একাধিকবার মাদক মামলায় গ্রেফতার হলেও স্বল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বের হয়ে পুনরায় অবৈধ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক
কচুয়াই ও খরনার সিন্ডিকেট
কচুয়াই ইউনিয়নে আমানতউল্লাহ বাচার নেতৃত্বে ২ নম্বর ওয়ার্ডের কালা মসজিদসংলগ্ন ছোট শাহেদ, ৪ নম্বর ওয়ার্ড পশ্চিম পাড়ার রানা এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের অলি আহমদের বাড়ির আলমগীর মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানা গেছে।
খরনা ইউনিয়নে মাহবুব, দিদার এবং লালারখীল এলাকার জহির আহমেদ, মো. হারুন ও নাছির উদ্দিন মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাদক উদ্ধার ও কোটি টাকার লেনদেন
গত ২৫ ডিসেম্বর হাইদগাঁও পাহাড়ি এলাকায় মাদক কারবারিদের একটি সক্রিয় আস্তানায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালায়। অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা, চোলাই মদ এবং মাদক কারবারিদের একটি হিসাবের খাতা উদ্ধার করা হয়। ওই খাতায় শুধু ডিসেম্বর মাসেই প্রায় এক কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য লিপিবদ্ধ ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে পটিয়া থানা পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত অভিযানে মাদক উদ্ধার ও কারবারিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। খুব শিগগিরই সিন্ডিকেটের মূল হোতাসহ তাদের সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
